বনে বনে খুঁজি মনে মনে খুঁজি (bone bone khuji mone mone khuji)

বনে বনে খুঁজি মনে মনে খুঁজি
চঞ্চল গোকুল-চন্দে।
খুঁজি যমুনার তীরে খুঁজি আঁখি নীরে
রাখালের বাঁশরিতে নূপুর-ছন্দে॥
খুঁজি সে কৃষ্ণে কৃষ্ণাতিথিতে
খুঁজি সে মাধবে মাধবী নিশীথে
খুঁজি সে শ্যামলে তমাল কুঞ্জে
মালতী মালায় হরি-চন্দন-গন্ধে॥
কংস বলে তাঁরে মধুকৈটভারি,
উদ্ধব বলে, তিনি প্রভু মুরারি
রুক্সিণী বলে, হরি জীবন-স্বামী মোর
রাধিকা বলে তারে, প্রীতম চিত-চোর।
শুক সারি বলে, আছে সে নামে
গোপী কয় সে রয় রাধারে লয়ে বামে,
গোষ্ঠে থাকে সখা, বলে শ্রীদামে
কোলে ঘুমায়, বলে যশোদা নন্দে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে এক নিবেদিত ভক্তের অন্তহীন অন্বেষণ, প্রেম এবং ঈশ্বর-উপলব্ধির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। কবি দেখিয়েছেন, কৃষ্ণ কোনো নির্দিষ্ট স্থান, কাল বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; তিনি প্রকৃতির সর্বত্র, ভক্তের হৃদয়ে এবং বিভিন্ন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নানাভাবে প্রকাশিত হন। তাই তাঁকে খুঁজে পাওয়ার সাধনা কখনও শেষ হয় না।

    গানের শুরুতেই কবি বলেন, তিনি বন থেকে বনে এবং নিজের মনের গভীরে সেই চঞ্চল গোকুলচন্দ্র শ্রীকৃষ্ণকে খুঁজে বেড়ান। তিনি যমুনার তীরে, নিজের অশ্রুসজল নয়নে এবং রাখালদের বাঁশির সুরে কৃষ্ণের নূপুরধ্বনির ছন্দ অনুভব করার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ কৃষ্ণের উপস্থিতি কেবল দৃশ্যমান রূপে নয়, প্রকৃতির সুর, স্মৃতি ও প্রেমময় অনুভূতির মধ্যেও বিরাজমান।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি বলেন, তিনি কৃষ্ণকে কৃষ্ণপক্ষের গভীর রাত্রিতে, মাধবকে মাধবীলতার সুগন্ধময় নিশীথে, শ্যামকে তমালকুঞ্জের নিবিড় ছায়ায় এবং হরিকে মালতীমালার সঙ্গে মিশে থাকা চন্দনের সুবাসে খুঁজে ফিরছেন। এখানে প্রকৃতির প্রতিটি রূপ, রং, গন্ধ ও পরিবেশ যেন কৃষ্ণেরই স্মারক হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, প্রকৃত ভক্তের কাছে সমগ্র বিশ্বজগৎই ঈশ্বরের উপস্থিতির এক অনন্ত প্রকাশ।

    এরপর কবি শ্রীকৃষ্ণের বহুমাত্রিক পরিচয় তুলে ধরেছেন। কংস তাঁকে দেখেছে নিজের বিনাশকারী মহাশক্তি হিসেবে; উদ্ধব তাঁকে প্রভু ও ঈশ্বররূপে উপলব্ধি করেছেন; রুক্মিণীর কাছে তিনি জীবনস্বামী; আর রাধিকার কাছে তিনি হৃদয়হরণকারী পরম প্রিয়তম। একই কৃষ্ণ, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভিন্ন ভিন্ন। প্রত্যেকেই নিজের অনুভব, বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁকে চিনেছে।

    গানের শেষাংশে এই ভাব আরও গভীর হয়েছে। শুক-সারী বলে, কৃষ্ণ তাঁর নামের মধ্যেই বিরাজ করেন; গোপীরা বলে, তিনি সর্বদা রাধাকে বাম পাশে নিয়ে থাকেন; শ্রীদামের কাছে তিনি শৈশবের অন্তরঙ্গ সখা; আর মা যশোদার কাছে তিনি সেই আদরের শিশু, যিনি তাঁর কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকেন। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণের মহিমা এতই ব্যাপক যে, তিনি একই সঙ্গে পরমেশ্বর, প্রেমিক, বন্ধু, পুত্র এবং ভক্তের হৃদয়ের আরাধ্য দেবতা।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে এপ্রিল  (বৃহস্পতিবার ১৫ বৈশাখ ১৩৪৫) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুল ইসলামের একটি চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিপত্রের এই গানটির উল্লেখ ছিল। কিন্তু এই বছরে এই গানটির কোনো রেকর্ড প্রকাশিত হয় নি। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১১ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০১৭।  পৃষ্ঠা: ৬০৭]
  • রেকর্ড:
    • রেকর্ড কোম্পানির সাথে চুক্তি [২৮ এপ্রিল ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার ১৫ বৈশাখ, ১৩৪৫ ) ]
    • এইচএমভি [১৯৩৮। রেকর্ডটি বাতিল হয়ে গেছে]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন ধর্মসঙ্গীত। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। অন্বেষণ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।