বনে যায় আনন্দ-দুলাল (bone jay anondo-dulal)

বনে যায় আনন্দ-দুলাল
বাজে চরণে নূপুরের রুনুঝুনু তাল
বনে যায় গোঠে যায়।
ও কি নন্দ-দুলাল, ও কি ছন্দ-দুলাল
ও কি নন্দন-পথ-ভোলা নৃত্য-গোপাল॥
বেণু-রবে ধেনুগণ আগে যেতে পিছে চায়
ভক্তের প্রাণ গ’লে উজান বহিয়া যায়
লুকিয়ে দেখিতে এলো দেবতারি দল (তায়)
হয়ে কদম তমাল -
ব্রজ-গোপিকার প্রাণ তার চরণে নূপুর
শ্রীমতী রাধিকা তার বাঁশরির সুর।
সে যে ত্রিলোকের স্বামী তাই ত্রিভঙ্গ-রূপ
করে বিশ্বের রাখালি সে চির-রাখাল॥ 

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের গোপালরূপ, তাঁর অনুপম সৌন্দর্য, সুমধুর বাঁশিবাদন এবং সমগ্র সৃষ্টিকে মোহিত করে তোলা ঈশ্বরীয় লীলার চিত্র মাধুর্যরস ও ভক্তিরসের সমন্বয়ে প্রকাশিত হয়েছে। কবি এখানে বৃন্দাবনের বনপথে বিচরণরত কৃষ্ণকে একাধারে নন্দদুলাল, গোপাল, নৃত্যশিল্পী এবং বিশ্বপালক পরমেশ্বর হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে প্রেম, আনন্দ ও ঐশ্বরিক মাধুর্যের প্রকাশ ঘটেছে।

    গানের শুরুতেই কবি দেখিয়েছেন, আনন্দের দুলাল শ্রীকৃষ্ণ বনপথে ও গোচারণভূমিতে গমন করছেন। তাঁর চরণের নূপুরের রুনুঝুনু ধ্বনি যেন সুর ও ছন্দের এক অপূর্ব মূর্ছনা সৃষ্টি করছে। তাঁর চলন এতই লাবণ্যময় যে তিনি যেন নৃত্য করতে করতে পথ অতিক্রম করছেন। তাই কবি তাঁকে ‘নন্দদুলাল’, ‘ছন্দদুলাল’ এবং ‘নৃত্যগোপাল’ নামে সম্বোধন করেছেন। এই বিশেষণগুলোর মাধ্যমে কৃষ্ণের সৌন্দর্য, লীলাময়তা ও আনন্দময় স্বভাবের প্রকাশ ঘটেছে।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, কৃষ্ণের বাঁশির সুর শুনে ধেনুগণ তাঁর আগে এগিয়ে গেলেও আবার পিছনে ফিরে তাকায়, যেন প্রিয় রাখালের সান্নিধ্য এক মুহূর্তের জন্যও হারাতে চায় না। তাঁর বাঁশির সুরে ভক্তের হৃদয়ও প্রেমের উজানে ভেসে যায়। এখানে বাঁশি কেবল সঙ্গীতের প্রতীক নয়; এটি পরমাত্মার সেই চিরন্তন আহ্বান, যা জীবাত্মাকে সংসারের মোহ ত্যাগ করে ঈশ্বরের দিকে আকৃষ্ট করে। এরপর কবি এক মনোরম কল্পচিত্র এঁকেছেন। শ্রীকৃষ্ণের লীলাদর্শনের আকাঙ্ক্ষায় দেবতারাও কদম ও তমালবৃক্ষের রূপ ধারণ করে বৃন্দাবনে এসে লুকিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, কৃষ্ণের লীলা ও রূপমাধুর্য কেবল মানবজগতেই নয়, দেবলোকেও সমানভাবে আকর্ষণের বিষয়। তাঁর সৌন্দর্য ও লীলারস সকল জগতের কাছে সমানভাবে পূজনীয়।

    গানের শেষাংশে কবি রাধা ও ব্রজগোপীদের সঙ্গে কৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। ব্রজগোপীদের প্রাণ যেন কৃষ্ণের চরণের নূপুর হয়ে তাঁর পদধ্বনির সঙ্গে অনুরণিত হচ্ছে, আর শ্রীমতী রাধিকা যেন তাঁর বাঁশির সুরে চিরদিনের জন্য মিশে আছেন। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, কৃষ্ণের লীলা ও প্রেম রাধা এবং গোপীদের ছাড়া পূর্ণতা লাভ করে না। তাঁদের আত্মা ও সত্তা কৃষ্ণের মধ্যেই বিলীন। সবশেষে কবি কৃষ্ণের দ্বৈত পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি একদিকে ত্রিলোকের অধীশ্বর, আবার অন্যদিকে বৃন্দাবনের সাধারণ রাখালবালক। তাঁর ত্রিভঙ্গিমা কেবল নৃত্যভঙ্গি নয়; এটি তাঁর মাধুর্যময় লীলার প্রতীক। যদিও তিনি সমগ্র বিশ্বজগতের পালনকর্তা, তবু তিনি চিরকাল ভক্তের কাছে সেই স্নেহময়, সহজ-সরল রাখালরূপেই ধরা দেন। তাই কবি বলেছেন, তিনি বিশ্বসংসারের রাখাল হলেও চিরদিনের জন্য ‘চির-রাখাল’।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪১) এইচএমভি এই গানের একটি রেকর্র্ড প্রথম প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ৩৫ বৎসর ছিল ৪-৫ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২৬২]
  • রেকর্ড: এইচএমভি। [অক্টোবর ১৯৩৪ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪১)। এন ৭২৯৪। শিল্পী: ধীরেন দাশ।  [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপকার: সুধীন দাশ। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, ষষ্ঠ খণ্ড (নজরুল ইন্সটিটিউট, ফাল্গুন ১৪০৩। ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)-এর ১৭ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৮৬-৮৭।]  [নমুনা]
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন ধর্মসঙ্গীত। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: ভজন

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।