বন্ধু তোমার দুয়ার বন্ধ (bondhu tomar duyar bondho)

বন্ধু তোমার দুয়ার বন্ধ।
তবু তোমার গৃহের পথে ছুটে কমল-গন্ধ॥
বন্ধু তোমার অলক-উড়া মনে পড়ে মনে পড়ে,
বন্ধু তোমার পুলক ঝরা আজও আছে বক্ষে ঝ’রে।
প্রথম যেদিন দুয়ার খোলা
দেখি তোমায় আপন ভোলা;
রাজপথেতে লোকের মেলা
                তুমি আপন সুরে অন্ধ॥
বন্ধু তুমি ভুলে যাওয়া গানের বুঝি সুর
হারিয়ে পাওয়া আলোকপুরের স্বপ্ন সুমধুর,
বন্ধু তোমার হাতের বীণা
তোমার মতই লজ্জাহীনা
তোমার মতই ছিন্ন ভিনা
            তোমার মতই হত-ছন্দ॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি এক চিরন্তন অভিযাত্রী। যিনি অজানার পরমপ্রিয়ের (পরমসত্তা) সঙ্গে মিলনের গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন। এখানে কবি নিজেকে এক উদাস পথিকের রূপে কল্পনা করেছেন, যিনি সংসারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সেই অনন্ত, অচিন ও চিরকাঙ্ক্ষিত প্রিয়তমের সন্ধানে অবিরাম এগিয়ে চলেছেন। কবি এগিয়ে চলেছেন অজানার পথে এবং পরমমিলনের প্রত্যাশায়।

    গানের শুরুতেই কবি বলেন, তিনি এক উতরোল স্রোতের মতো অসীমের দিকে বয়ে চলেছেন। তাঁর গন্তব্য এমন এক অচেনা ও অজানা লোক, যার পরিচয় তিনি জানেন না। এই অজানা পথ কোনো ভৌগোলিক পথ নয়; এটি আত্মার আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার প্রতীক। মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়ে এক অদৃশ্য গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়, কিন্তু সেই পথের শেষ কোথায়—তা তার জানা থাকে না। তবু অন্তরের এক অদম্য আকর্ষণ তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি বলেন, তিনি পথের সঠিক দিশা জানেন না। কিন্তু এক উদাসী পথিক যেমন অন্তরের টানে পথ চলতে থাকে, তেমনি তিনিও সেই রহস্যময় বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। এখানে বাঁশির সুর পরমসত্তার আহ্বানের প্রতীক। সেই আহ্বান মানুষের হৃদয়কে সংসারের মোহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনন্ত সত্যের পথে আকৃষ্ট করে। ফলে তাঁর মনও উদাস হয়ে উঠেছে; পার্থিব কোনো বন্ধন আর তাঁকে স্থির রাখতে পারে না।

    গানের শেষাংশে কবি স্বীকার করেছেন- যে, তিনি জানেন না, কবে তাঁর এই অভিসার সফল হবে, কবে তিনি সেই পরমপ্রিয়ের মুখোমুখি হতে পারবেন। তাঁর প্রিয় কোন দেশে আছেন, কোন পথের শেষে তাঁর সঙ্গে মিলন ঘটবে—সে-সম্পর্কে তাঁর কোনো নিশ্চিত জ্ঞান নেই। কিন্তু এই অজানা এবং  অনিশ্চয়তা তাঁর সাধনাকে থামিয়ে দেয় না; বরং প্রিয়ের দর্শনের আশায় তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে থাকে এবং হৃদয় ব্যাকুল প্রতীক্ষায় দিন গোনে। আধ্যাত্মিক অর্থে, এই গানে ‘অভিসার’ কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনযাত্রা নয়; এটি জীবাত্মার পরমাত্মাকে ছাড়িয়ে পরমসত্তার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রতীক। মানুষের সমগ্র জীবনই যেন সেই অভিসারের প্রস্তুতি। পথ অজানা, গন্তব্য অদেখা, তবু অন্তরের গভীর থেকে আসা পরমসত্তার আহ্বান মানুষকে নিরন্তর এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়। সেই কারণেই কবির কাছে পথের অনিশ্চয়তা কোনো বাধা নয়; বরং তা তাঁর সাধনারই অংশ।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৭৯০। পৃষ্ঠা: ২৪১]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। অন্বেষণ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।