বরণ করে নিওনো গো নিও হরণ ক’রে (boron kore niono go nio horon kore)

বরণ করে নিওনো গো নিও হরণ ক’রে।
ভীরু আমায় জয় কর গো তোমার মনের জোরে॥
পরান ব্যাকুল তোমার তরে
চরণ শুধু বারণ করে,
লুকিয়ে থাকি তোমার আশায় রঙিন বসন প’রে॥
লজ্জা আমার ন নদিনী জটিলারই প্রায়,
যখনই যাই, শ্যামের কাছে দাঁড়ায়ে আছে ঠায়।
চাইতে নারি চোখে চোখে
দেখে পাছে কোন লোকে,
নয়নকে তাই শাসন (বারণ) করি অশ্রুজলে ভ’রে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি রাধার গভীর প্রেম, আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা, লজ্জা, সংকোচ এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বাহ্যিকভাবে তিনি নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করলেও অন্তরে অন্তরে তিনি সম্পূর্ণভাবে শ্যামের প্রেমে সমর্পিত। এই দ্বৈত অনুভূতিই গানের মূল সুর।

    গানের শুরুতেই রাধা কৃষ্ণের কাছে নিবেদন করেন—তিনি যেন তাঁকে কেবল গ্রহণই না করেন, বরং সম্পূর্ণভাবে নিজের প্রেমে অধিকার করে নেন। তিনি স্বীকার করেন যে, স্বভাবত তিনি ভীরু ও সংকোচশীলা; তাই নিজের শক্তিতে প্রেমের পথে এগিয়ে যেতে পারেন না। এজন্য তিনি প্রিয়তমের প্রেম, সাহস ও আকর্ষণের শক্তিতেই নিজেকে জয় করার প্রার্থনা করেন। এখানে ‘হরণ করে’ কথাটি জোরপূর্বক অপহরণের অর্থে নয়; বরং প্রেমের অপরাজেয় আকর্ষণে আত্মসমর্পণের প্রতীক।

    গানটির পরবর্তী অংশে রাধা বলেন, প্রাণপ্রিয় কৃষ্ণের জন্য তাঁর মন ব্যাকুল হলেও তাঁর পদক্ষেপ যেন বারবার থেমে যায়। হৃদয় তাঁকে কৃষ্ণের দিকে টেনে নিয়ে যায়, কিন্তু লজ্জা, ভয় ও সামাজিক সংকোচ তাঁকে বাধা দেয়। তবু তিনি সুন্দর সাজে, রঙিন বসন পরে, গোপনে কৃষ্ণের আশায় অপেক্ষা করেন। এই সাজসজ্জা বাহ্যিক অলংকারের চেয়ে অন্তরের মিলনপ্রত্যাশারই বহিঃপ্রকাশ।

    গানের শেষাংশে রাধা তাঁর সংকোচের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, তাঁর লজ্জা যেন ননদিনী ও জটিলার কঠোর নজরদারির মতোই প্রবল। বৈষ্ণব কাব্যে ননদিনী (কুটিলা) ও জটিলা রাধার প্রেমপথের সামাজিক প্রতিবন্ধকতার প্রতীক। যখনই তিনি কৃষ্ণের কাছে যেতে চান, তখনই মনে হয় কেউ না কেউ তাঁকে লক্ষ্য করছে। লোকলজ্জা ও সমাজের ভয়ে তিনি কৃষ্ণের চোখে চোখ রাখতে পারেন না। তাই নিজের নয়নকেও সংযত রাখতে চান, কিন্তু সেই সংযম শেষ পর্যন্ত অশ্রুধারায় ভেঙে পড়ে। তাঁর চোখের জলই প্রকাশ করে অন্তরের গভীর প্রেম, বিরহ ও অসহায়তা।

    আধ্যাত্মিক অর্থে, এই গানে রাধা জীবাত্মার এবং কৃষ্ণ পরমাত্মার প্রতীক। জীবাত্মা পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভ করতে চাইলেও অহংকার, ভয়, লজ্জা, সামাজিক আসক্তি ও সংসারধর্মের নানা বন্ধন তাকে বারবার আটকে রাখে। তবু অন্তরের গভীরে পরমপ্রেমের আকর্ষণ কখনও নিঃশেষ হয় না। তাই সে পরমসত্তার করুণাশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে, যেন তিনি নিজেই সব বাধা দূর করে আপন সান্নিধ্যে টেনে নেন।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার ২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৪২) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের গান রেকর্ডের বিষয় চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিতে এই গানটি ছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৬ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ। ১৫৯৫ সংখ্যক গান। রাগ: মিশ্র গান্ধারী। তাল: ত্রিতাল। পৃষ্ঠা: ৪৭৭।
    • নজরুলের হারানো গানের খাতা [নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। আষাঢ় ১৪০৪/জুন ১৯৯৭। গান সংখ্যা ৯৯। for Shiwli । পৃষ্ঠা: ১২৬।]
    • সঙ্গীতাঞ্জলি। তৃতীয় খণ্ড। স্বরলিপিকার: নিতাই ঘটক [দ্বিতীয় সংস্করণ। ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৮৪। পৃষ্ঠা: ৪৬-৪৭।] মিশ্র গান্ধারী-ত্রিতাল। [নমুনা]
    • নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি ঊনপঞ্চাশতম খণ্ড। স্বরলিপিকার: ইদ্‌রিস আলী। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, কার্তিক ১৪২৬। নভেম্বর ২০১৯। পৃষ্ঠা: ১০৬-১০৮ [নমুনা]
       
  • রেকর্ড:
    • এইচএমভি'র সাথে নজরুলে চুক্তি [১২ ডিসেম্বর ১৯৩৫  (বৃহস্পতিবার ২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৪২)]।
    • টুইন [এপ্রিল ১৯৩৬ (চৈত্র ১৩৪২-বৈশাখ ১৩৪৩)। এফটি ৪৩২৪। শিল্পী: শিউলি সরকার]
       
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ:  ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিব্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধা। আত্মনিবেদন
    • সুরাঙ্গ:
      • স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর [ইদ্‌রিস আলী-কৃত স্বরলিপি]
      • খেয়ালাঙ্গ [নিতাই ঘটক-কৃত স্বরলিপি]
    • তাল:
      • দাদরা [ইদ্‌রিস আলী-কৃত স্বরলিপি]
      • ত্রিতাল [নিতাই ঘটক-কৃত স্বরলিপি]
      • গ্রহস্বর:
        • স [ইদ্‌রিস আলী-কৃত স্বরলিপি]
        • প [নিতাই ঘটক-কৃত স্বরলিপি]

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।