বরষার দিন তো হয়ে গেছে সারা তবু কেন (boroshar din to hoye gechhe sara tobu keno)

বরষার দিন তো হয়ে গেছে সারা তবু কেন ঝরে বাদল।
বনের বেদের দল গেছে তো চলি’, তবে ও কে বাজায় মাদল॥
ও সই কৃষ্ণ তো গেছে কবে মথুরায়
কেন বৃন্দাবনে চাঁদ ওঠে হায়,
কেন আঁখি-জলে ভেসে যায়, নয়ন কাজল॥
আহা সাথীহারা রাধা পাগলিনী প্রায়,
নিদহারা প্রাণ তার বাঁশি শুনে ছুটে যায়।
ও কে গভীর রাতে যন কিসের আশে
ঘুরিয়া বেড়ায় সেই যমুনা পাশে,
দেখিতে না পায় মুরছিত বেদনায় পড়িল রাধা ধরণীর তল

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের মথুরাগমনের পর রাধার অসীম বিরহবেদনা, স্মৃতিমগ্নতা এবং প্রিয়তমের প্রত্যাবর্তনের নিরন্তর প্রতীক্ষা করুণ মাধুর্যে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্য, শব্দ ও ঋতু যেন রাধার অন্তরের বেদনার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছে। কবি দেখিয়েছেন, বাহ্যিকভাবে সময় এগিয়ে গেলেও সত্যিকারের প্রেমিকের হৃদয়ে বিচ্ছেদের ক্ষত কখনও শুকিয়ে যায় না।

    গানের শুরুতেই কবি বলেন, বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেলেও এখনও কেন বৃষ্টিধারা ঝরে? বনের বেদেদের দল চলে গেছে, তবু কে যেন মাদল বাজিয়ে চলেছে। এই প্রশ্নগুলো প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিকে উদ্দেশ করে নয়; এগুলো রাধার অন্তরের আর্তি। বর্ষার বৃষ্টি যেন তাঁর অবিরাম অশ্রুধারা, আর দূরাগত মাদলের ধ্বনি যেন অতীতের প্রেমস্মৃতিকে বারবার জাগিয়ে তুলছে। অর্থাৎ প্রকৃতির প্রতিটি শব্দ ও দৃশ্য তাঁর বিরহকে আরও গভীর করে তুলছে।

    এরপর কবি স্মরণ করিয়ে দেন যে, কৃষ্ণ তো অনেক আগেই মথুরায় চলে গেছেন। তাহলে এখনও কেন বৃন্দাবনের আকাশে চাঁদ ওঠে, কেন চোখের জল কাজল ধুয়ে নিয়ে যায়? এখানে চাঁদ মিলনের স্মৃতি এবং অশ্রু বিচ্ছেদের প্রতীক। কৃষ্ণহীন বৃন্দাবনের সৌন্দর্য রাধার কাছে আর আনন্দের নয়; বরং তা হারিয়ে যাওয়া সুখের স্মৃতি জাগিয়ে তাঁর হৃদয়কে আরও ব্যথিত করে।

    গানটির পরবর্তী অংশে রাধার মানসিক অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে। প্রিয় সঙ্গীকে হারিয়ে তিনি প্রায় উন্মাদিনীর মতো হয়ে পড়েছেন। রাতে যদি কোথাও বাঁশির মতো কোনো সুর কানে আসে, তবে তিনি মনে করেন কৃষ্ণ বুঝি ফিরে এসেছেন। সেই আশায় তিনি সবকিছু ভুলে ছুটে যান। এখানে বাঁশির সুর বাস্তবের চেয়ে স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষারই প্রতীক। কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতেও তাঁর স্মৃতি রাধার হৃদয়ে এত জীবন্ত যে, সামান্য সুরও তাঁকে আলোড়িত করে।

    গানের শেষাংশে দেখা যায়, গভীর রাতে কেউ একজন যমুনার তীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই ‘কে’ আসলে বিরহবিধুর রাধা, যিনি ক্ষীণ আশা নিয়ে প্রিয়তমের সন্ধানে যমুনার তীরে ঘুরে বেড়ান। কিন্তু কৃষ্ণকে দেখতে না পেয়ে তিনি গভীর বেদনায় মূর্ছিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই দৃশ্য রাধার বিরহের চরম পরিণতি এবং তাঁর প্রেমের গভীরতার পরিচায়ক।

    আধ্যাত্মিক অর্থে, এই গানে রাধা জীবাত্মার এবং কৃষ্ণ পরমাত্মার প্রতীক। জীবাত্মা যখন পরমাত্মার সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে, তখন সমগ্র জগৎ, প্রকৃতি ও স্মৃতি তাকে সেই চিরপ্রিয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু তাঁর প্রত্যক্ষ দর্শন না পেয়ে হৃদয় ব্যাকুল ও শূন্য হয়ে থাকে। সেই ব্যাকুলতাই ভক্তির গভীরতম রূপ।
     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 
  •  গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২৫০২ গান। পৃষ্ঠা: ৭৭১।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধা। বিরহ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।