বল কতদূর! আর কতদূর!! (bol kotodur ar kotodur)

বল কতদূর! আর কতদূর!! কবে হবে পথ অবসান।
তোমারি কণ্ঠে শুনিব হে স্বামী, কবে তব প্রিয় আহ্বান॥
শ্রান্ত মনের বেদনার ভার, ক্লান্ত তনু বহে না যে আর,
দিন শেষে আজ তোমার চরণে, দাও মোরে, প্রিয়, স্থান॥
রহিতে যে নারি ধৈরজ ধরি, যাচি হে তোমার দেখা।
পথের বেদন সহিতে যে নারি, পথের মাঝারে একা।
শুনেছি তোমার বাঁশরির সুর, কোন্ সে অতীতে দূর বহুদূর
তব বাঁশরির সুরে সঙ্গীত ঢালি (আজি) শোনাও সে প্রেম-গান

  • ভাবসন্ধান: এই গানে এক ক্লান্ত, বিরহাতুর ও ঈশ্বরানুরাগী সাধকের অন্তরের আর্তি গভীর আবেগের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। সংসারজীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি অবসন্ন ও শ্রান্ত। তাই তিনি আকুল হয়ে প্রভুকে প্রশ্ন করেন—আর কত দূর এই পথ চলতে হবে? কবে এই অন্তহীন যাত্রার অবসান ঘটবে এবং কবে তিনি তাঁর পরম প্রিয় স্বামীর—অর্থাৎ পরমসত্তার— স্নেহময় আহ্বান শুনে তাঁর সান্নিধ্যে পৌঁছতে পারবেন? এখানে ‘পথ’ মানুষের জীবনযাত্রার এবং ‘পথের অবসান’ পার্থিব জীবনসংগ্রামের সমাপ্তি ও পরমসত্তার সান্নিধ্য লাভের প্রতীক।

    কবি জানান, দীর্ঘ জীবনের দুঃখ, বেদনা ও সংগ্রামের ভারে তাঁর মন ও শরীর উভয়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সংসারের নানা দুঃখ-কষ্ট বহন করার শক্তি তাঁর আর অবশিষ্ট নেই। তাই দিনের শেষে পথিক যেমন আশ্রয়ের সন্ধান করে, তেমনি তিনিও পরম করুণাময়ের চরণে চিরশান্তির আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এখানে ‘দিন শেষে’ শুধু দিনের সমাপ্তি নয়, জীবনের অন্তিম পর্বেরও প্রতীক।

    গানটির পরবর্তী অংশে ভক্তের ঈশ্বরদর্শনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছেন না; একাকী জীবনের দুঃখ ও পথের বেদনা তাঁর পক্ষে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই নিঃসঙ্গ পথচলায় তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা প্রভুর দর্শন লাভ। মানুষের আত্মা যখন সংসারের ক্ষণস্থায়ী সুখে তৃপ্ত হতে পারে না, তখন সে পরম সত্যের সান্নিধ্যের জন্য এমনই ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

    গানের শেষাংশে কবি স্মরণ করেন সেই চিরন্তন বাঁশরির সুর, যা বহু দূর অতীত থেকে তাঁর হৃদয়ে অনুরণিত হয়ে আসছে। এই বাঁশরি শ্রীকৃষ্ণের দিব্য আহ্বানের প্রতীক, আবার পরমাত্মার অনাদি ডাকারও প্রতীক। সেই অলৌকিক সুর একসময় তাঁর হৃদয়ে প্রেম, ভক্তি ও আত্মনিবেদনের জাগরণ ঘটিয়েছিল। তাই তিনি আবার সেই প্রেমময় সঙ্গীত শুনতে চান, যা তাঁর আত্মাকে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনের পথে আহ্বান জানায় এবং সকল দুঃখ, ক্লান্তি ও বিচ্ছেদের অবসান ঘটায়।

    সার্বিকভাবে, গানটি জীবনের ক্লান্তিকর সংগ্রামের মধ্যেও পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা, আত্মসমর্পণের বাসনা এবং ঈশ্বরপ্রেমের গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক অনুপম প্রকাশ। এখানে সংসারজীবনের পথচলা, বিরহ, ক্লান্তি ও একাকিত্ব শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরমিলনের আশায় আলোকিত হয়ে উঠেছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু যায় নি। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের  ২৭ ফেব্রুয়ারি (বৃ্হস্পতিবার ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২), জগৎঘটকের রচিত জীবনস্রোত গীতি-আলেখ্য, কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এই নাটকে এ গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৭ মাস।
     
  • গ্রন্থ:  নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২।] গান সংখ্যা ২৯৯৭ গান
  • বেতার:
    • জীবনস্রোত [গীতি-আলেখ্য।  রচনা জগৎঘটক। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬। ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২। সান্ধ্য অনুষ্ঠান: ৮.৩০-৯.১৪ মিনিট
      • সূত্র:
        • বেতার জগৎ। সপ্তম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা। ১৬ ফেব্রুয়ারি. ১৯৩৬ ।পৃষ্ঠা ১৭২
        • The Inidian Listener font size.4.Vol I No 4, Page 232
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। আশা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।