বহু পথে বৃথা ফিরিয়াছি প্রভু হইব না আর পথহারা (bohu pothe britha firiachhi)
বহু পথে বৃথা ফিরিয়াছি প্রভু হইব না আর পথহারা
বন্ধু স্বজন সব ছেড়ে যায় তুমি একা জাগো ধ্রুবতারা॥
মায়ারূপী হায় কত স্নেহ-নদী,
জড়াইয়া মোরে ছিল নিরবধি,
সব ছেড়ে গেল, হারাইনু যদি তুমি এসো প্রাণে প্রেম ধারা॥
ভ্রান্ত পথের শ্রান্ত পথিক লুটায় তোমার মন্দিরে,
প্রভু আরো যদি কিছু আছে মোর প্রিয় লও বাঁচায়ে বন্দীরে।
ডাকি' লও মোরে মুক্ত আলোকে
তব আনন্দ-নন্দন-লোকে,
শান্ত হোক এ ক্রন্দন, আর সহে না এ বন্ধন-কারা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে সংসারজীবনের ভ্রান্তি, মায়া, বিচ্ছেদ ও ক্লান্তির মধ্য দিয়ে পরমাত্মার শরণাগত হওয়ার আকুল আকাঙ্ক্ষা উপস্থাপিত হয়েছে। কবি উপলব্ধি করেন যে, জীবনের নানা মোহ, প্রলোভন ও ক্ষণস্থায়ী সুখের সন্ধানে তিনি বহু পথ ঘুরেছেন, কিন্তু কোথাও প্রকৃত শান্তি ও পরিতৃপ্তি পাননি। তাই তাঁর দৃঢ় সংকল্প— তিনি আর পথভ্রষ্ট হবেন না; তিনি কেবল পরমসত্তাকেই জীবনের একমাত্র আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করবেন।
কবির অভিমত, সংসারের বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন ও আপনজন একসময় দূরে সরে যায়; পার্থিব সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী এবং স্বার্থের পরিবর্তনের সঙ্গে তার রূপও বদলে যায়। কিন্তু পরমসত্তা ধ্রুবতারার মতো চিরস্থায়ী, অবিচল ও পথপ্রদর্শক। অন্ধকার রাত্রিতে যেমন ধ্রুবতারা পথিককে সঠিক পথের দিশা দেয়, তেমনি জীবনের বিভ্রান্তির মধ্যেও তিনিই মানুষের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক।
গানের পরবর্তী অংশে কবি সংসারের মায়াকে স্নেহনদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। পারিবারিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, সম্পদ ও নানা পার্থিব আকর্ষণ তাঁকে দীর্ঘদিন আবদ্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেইসব সম্পর্ক ও আসক্তি একে একে বিলীন হয়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে, যদি সবকিছু হারিয়েও ঈশ্বরের প্রেম লাভ করা যায়, তবে সেই হারানোই প্রকৃত লাভ। তাই তিনি প্রার্থনা করেন, পরমেশ্বর যেন তাঁর হৃদয়কে নিজের প্রেমধারায় সিক্ত করেন। এরপর কবি নিজেকে ‘ভ্রান্ত পথের শ্রান্ত পথিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। দীর্ঘ জীবনসংগ্রামে ক্লান্ত হয়ে তিনি পরমাত্মার মন্দিরে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তাঁর জীবনে যা কিছু এখনও মূল্যবান বা পবিত্র অবশিষ্ট আছে, তা-ও তিনি তাঁর চরণে সমর্পণ করতে প্রস্তুত। এখানে আত্মসমর্পণের মধ্যেই তিনি মুক্তির পথ খুঁজে পান।
গানের শেষাংশে কবি মুক্তির জন্য আন্তরিক প্রার্থনা করেন। তিনি চান, পরমাত্মা তাঁকে অজ্ঞান, মায়া ও দুঃখের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে জ্ঞান, শান্তি ও আনন্দের আলোকময় জগতে নিয়ে যান। ‘আনন্দ-নন্দন-লোক’ ঈশ্বরের চিরশান্তিময় সান্নিধ্যের প্রতীক, যেখানে দুঃখ, ভয় ও বন্ধনের কোনো স্থান নেই। তিনি প্রার্থনা করেন, তাঁর অন্তরের ক্রন্দন যেন স্তব্ধ হয় এবং সংসারের বন্ধনরূপ কারাগার থেকে তিনি চিরমুক্তি লাভ করেন।
সার্বিকভাবে, গানটি মানুষের আত্মিক অভিযাত্রার এক গভীর প্রকাশ। সংসারের ক্ষণস্থায়ী মোহ, সম্পর্ক ও ভোগবিলাসের অসারতা উপলব্ধি করে কবি পরমেশ্বরের প্রেম, আশ্রয় ও মুক্তির পথ অনুসন্ধান করেছেন। এখানে ঈশ্বরকে ধ্রুবতারার মতো চিরন্তন পথপ্রদর্শক এবং মানুষের জীবনের একমাত্র অবিনশ্বর আশ্রয় হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। আত্মসমর্পণ, পরমাত্মার প্রতি প্রেম ও মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাই এই গানের মূল সুর।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪০), মাসে এইচএমভি থেকে এই গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৫-৬ মাস।
- গ্রন্থ: গীতি-শতদল প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। ভজন]।
- রেকর্ড: এইচএমভি। ডিসেম্বর ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। ১৫ অগ্রহায়ণ-১৬ পৌষ ১৩৪০। পি ১১৭৭৬। শিল্পী: ইন্দুবালা।[শ্রবন নমুনা]
- ইয়াকুব আলী খান [শ্রবণ নমুনা] (নজরুল উৎসব ২০২৩ উপলক্ষে প্রকাশিত ১২৫ জন শিল্পীর গান)
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড (নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)] ১৮ সংখ্যক গান [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। আত্মনিবেদন
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: সপা