(বাঁকা) শ্যাম হে তোমায় পেয়েছি আজ খুঁজে (baka shyam he tomay peyechhi aj khuje)

(বাঁকা) শ্যাম হে তোমায় পেয়েছি আজ খুঁজে।
মথুরাতে ঠেকে আছ শ্রীকুবুজার কুঁজে॥
মিলেছে বেশ বাঁকায়-বাঁকায়
গোঠের শ্যাম আর মুটের ঝাঁকায়
রসিক বিনা কুঁজের এমন মর্ম কে আর বুঝে॥
ব্রজের ধেনু ফেলে মথুরাতে এলে বুঝি উট চরাতে,
একবার উঠে দাঁড়াও উঠের কুঁজ ধ’রে বাম ভুজো॥
ব্রজে গোবর্দ্ধন ধরেছিলে
এবার কুঁজীর কুঁজ ধরিলে, শ্যাম হে –
ওহে কুব্জাধারী রূপ নেহারি নয়ন আসে বুঁজে।
লাজে নয়ন আসে বুঁজে॥
গয়লার বাঁক নি এসে
সাজিয়েছ কি কুব্জা বেশে?
তাই বাঁক দিয়ে শ্যাম যুগল বাঁকা বেঁকী গেলাম পুজে॥

  • ভাবসন্ধান: এই রঙ্গ-ব্যঙ্গধর্মী গানে কবি শ্রীকৃষ্ণের মথুরা-পর্বের একটি সুপরিচিত পৌরাণিক ঘটনাকে অবলম্বন করে কৌতুক, পরিহাস ও শব্দরসের মনোরম সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী, মথুরায় শ্রীকৃষ্ণ সুগন্ধি বহনকারী কুব্জা নামে এক কুঁজওয়ালা দাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর শরীরের কুঁজ সোজা করে দেন। এই ঘটনাকেই কবি লোকরসের আলোকে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে নতুন রূপ দিয়েছেন।

    গানের শুরুতেই বক্তা কৌতুক করে বলেন, বহুদিন পরে তিনি শ্যামকে খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু ব্রজের চিরচেনা কৃষ্ণরূপে নয়; বরং মথুরায় কুব্জার ‘কুঁজে’ যেন তিনি আটকে আছেন। এখানে ‘কুঁজে ঠেকে আছ’ কথাটি আক্ষরিক অর্থে নয়; বরং কুব্জার প্রতি কৃষ্ণের অনুকম্পা ও সান্নিধ্যকে হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ‘বাঁকা শ্যাম’ এবং ‘কুঁজ’—এই দুই বক্রতার মিল থেকেই গানের প্রধান শব্দকৌতুক সৃষ্টি হয়েছে।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, ব্রজের ‘বাঁকা’ শ্যাম আর কুব্জার ‘বাঁকা’ দেহ যেন পরস্পরের সঙ্গে খুব মানিয়ে গেছে। ‘গোঠের শ্যাম’ ও ‘মুটের ঝাঁকা’—এই তুলনার মাধ্যমে কৃষ্ণের ঐশ্বরিক রূপকে ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ জীবনের উপমার সঙ্গে মিলিয়ে হাস্যরস সৃষ্টি করা হয়েছে। ‘রসিক বিনা কুঁজের এমন মর্ম কে আর বুঝে’—এই পঙ্ক্তিতে বোঝানো হয়েছে যে, এই ব্যঙ্গ ও শব্দরসের আসল আনন্দ কেবল রসগ্রাহী শ্রোতাই উপলব্ধি করতে পারবেন।

    এরপর কবি আরও মজার ভঙ্গিতে বলেন, কৃষ্ণ বুঝি আর ব্রজের গরু চরান না; এখন তিনি মথুরায় এসে উট চরান। উটের কুঁজ এবং কুব্জার কুঁজ— এই ধ্বনিগত ও দৃশ্যগত মিলকে কেন্দ্র করে এই কৌতুক নির্মিত হয়েছে। একইভাবে, ব্রজে যিনি গোবর্ধন পর্বত ধারণ করেছিলেন, এখন তিনি নাকি কুব্জার কুঁজ ধারণ করেছেন। এখানে ‘গোবর্ধনধারী’ উপাধিকে ব্যঙ্গরসের ছলে ‘কুব্জাধারী’-তে রূপান্তর করা হয়েছে। এটি শ্রীকৃষ্ণকে অবমাননা করার জন্য নয়; বরং লোকসংগীতের সহজ-সরল হাস্যরসের একটি কাব্যিক কৌশল।

    গানটির শেষাংশে  বক্তা প্রশ্ন করেন, কৃষ্ণ কি তবে গয়ালার স্বাভাবিক বাঁকা ভঙ্গি ছেড়ে কুব্জারই বেশ ধারণ করেছেন? এই ‘বাঁক’ শব্দটি এখানে বহু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—কৃষ্ণের ত্রিভঙ্গিমা, কুব্জার কুঁজ, প্রেমের বাঁক এবং কৌতুকের বাঁক। এই বাঁকার আকর্ষণেই বক্তাও যেন মোহিত হয়ে ‘বাঁকা’ কৃষ্ণকে পূজা করতে গিয়ে নিজেও ‘বেঁকে’ যান। অর্থাৎ কৃষ্ণের রূপ, লীলা ও প্রেমের আকর্ষণে তিনি সম্পূর্ণভাবে আত্মহারা হয়ে পড়েন।

    সার্বিকভাবে, গানটি শ্রীকৃষ্ণের মথুরা-লীলাকে অবলম্বন করে রচিত একটি লোকরসাত্মক ব্যঙ্গগান। এখানে ব্যঙ্গের লক্ষ্য শ্রীকৃষ্ণ নন; বরং তাঁর লীলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া মধুর কৌতুক। ‘বাঁকা’, ‘কুঁজ’, ‘কুব্জা’, ‘উটের কুঁজ’, ‘গোবর্ধনধারী’ ও ‘কুব্জাধারী’—এইসব শব্দের বহুমাত্রিক ব্যবহার গানের প্রধান অলঙ্কার। এর মাধ্যমে কবি হাস্যরস, শব্দকৌতুক এবং কৃষ্ণভক্তির এক অভিনব সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৬)  মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ২০৪৩ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬১৫।]
  • রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৬)।  রেকর্ড নং- এফটি. ১৩০১০। শিল্পী: গোলাম ভট্টাচার্য]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: হাস্যরসাত্মক, সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।