বাঁকা শ্যামল এলো বন-ভবনে (baka shyamol elo bon-bhobone)

বাঁকা শ্যামল এলো বন-ভবনে
তার বাঁশির সুর শুনি পবনে॥
        রাঙা সে চরণের নূপুর-রোলে রে
        আকুল এ হৃদয় পুলকে দোলে রে
সে নূপুর শুনি’ নাচে ময়ূর কদম তমাল-বনে॥
        বুঝি সেই শ্যামের পরশ লাগিল
        আমার চরণে তাই নাচন জাগিল 

ঘিরি শ্যামে দখিন-বামে নেচে বেড়াই আপন মনে॥
        এলো মাধবী চাঁদ গগন আঙিনায়
        জোয়ার এসেছে তাই হৃদয় যমুনায়
খুলিয়া গলার মালা পরাব শ্যামেরি বরণে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের আগমনকে কেন্দ্র করে প্রকৃতি, মানবহৃদয় ও সমগ্র সৃষ্টিজগতের আনন্দোচ্ছ্বাস এক অপূর্ব কাব্যিক রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে কৃষ্ণ কেবল বৃন্দাবনের নায়ক নন; তিনি প্রেম, সৌন্দর্য, আনন্দ ও চিরন্তন জীবনীশক্তির প্রতীক। তাঁর আগমনের সংবাদে প্রকৃতি যেমন সজীব হয়ে ওঠে, তেমনি ভক্তের হৃদয়ও প্রেম ও ভক্তির উচ্ছ্বাসে আন্দোলিত হয়।

    গানের শুরুতেই কবি বলেন, বাঁকা শ্যামল বনভবনে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর বাঁশির সুর বাতাসে ভেসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বাঁশি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি নয়; এটি পরমাত্মার প্রেমময় আহ্বানের প্রতীক। সেই সুর মানুষের অন্তরে সুপ্ত প্রেম, ভক্তি ও আনন্দকে জাগিয়ে তোলে। ফলে সমগ্র প্রকৃতি যেন তাঁর আগমনের সংবাদে মুখর হয়ে ওঠে।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি শ্রীকৃষ্ণের রাঙা চরণের নূপুরধ্বনির বর্ণনা করেছেন। সেই মধুর রিনিঝিনি শব্দে ভক্তের হৃদয় আনন্দে দুলে ওঠে এবং পুলকে ভরে যায়। এমনকি কদম ও তমালবনের ময়ূরও নূপুরের তালে নৃত্যে মেতে ওঠে। এখানে ময়ূরের নৃত্য প্রকৃতির উল্লাসের প্রতীক; অর্থাৎ কৃষ্ণের উপস্থিতিতে সমগ্র সৃষ্টি আনন্দোচ্ছ্বাসে সাড়া দেয়। এরপর ভক্ত অনুভব করেন, যেন শ্রীকৃষ্ণের অলৌকিক স্পর্শ তাঁর নিজের জীবনেও এসে পৌঁছেছে। সেই স্পর্শে তাঁর পদযুগলেও নৃত্যের সঞ্চার হয়েছে। তিনি আর নিজের অস্তিত্বের কথা ভাবতে পারেন না; দক্ষিণে-বামে, চারদিকে কৃষ্ণকে ঘিরেই তাঁর নৃত্য ও আনন্দের প্রকাশ ঘটে। এই নৃত্য বাহ্যিক নয়, অন্তরের ভক্তি, প্রেম ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক।

    গানের শেষাংশে প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। আকাশে মাধবী চাঁদের উদয় হয়েছে, আর তার প্রভাবে হৃদয়-যমুনায় জোয়ারের সৃষ্টি হয়েছে। 'হৃদয়-যমুনা' মানুষের অন্তর্জগতের প্রতীক, যেখানে কৃষ্ণপ্রেমের উচ্ছ্বাস জোয়ারের মতো প্রবাহিত হচ্ছে। এই প্রেমোচ্ছ্বাসের পরিণতিতে ভক্ত নিজের গলার মালা খুলে শ্রীকৃষ্ণকে পরিয়ে দিতে চান। এই মালা নিবেদন কেবল ফুলের মালা অর্পণ নয়; বরং নিজের হৃদয়, প্রেম, ভক্তি ও সমগ্র সত্তাকে পরমপ্রিয়ের চরণে সমর্পণের প্রতীক।

    সার্বিকভাবে, গানটি শ্রীকৃষ্ণের আগমনে ভক্তহৃদয়ের আনন্দ, প্রকৃতির নবজাগরণ এবং ঈশ্বরপ্রেমে আত্মবিস্মৃত হওয়ার এক সুরম্য কাব্যচিত্র। বাঁশির সুর, নূপুরধ্বনি, ময়ূরের নৃত্য, যমুনার জোয়ার ও মালা নিবেদনের প্রতিটি চিত্রকল্প ভক্তিরসকে গভীরতর করেছে। এখানে প্রেম, প্রকৃতি ও ভক্তি একসূত্রে গাঁথা হয়ে মানুষের আত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের আনন্দময় অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৪) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ৭১৩ সংখ্যক গান
  • রেকর্ড: এইচএমভি [জুলাই ১৯৩৭ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৪)। এন ৯৯২০। শিল্পী: সীতা দেবী। সুর: কমল দাশগুপ্ত] [শ্রবণ নমুনা]
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: আহসান মুর্শেদ।  নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (ঊনবিংশ খণ্ড)। ১৭ সংখ্যক গান] [নমুনা]
  • সুরকার: কমল দাশগুপ্ত
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। আগমনী
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয়

 

 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।