বাঁধিয়া দুইজনে দুঁহু ভুজ বন্ধনে কাঁদিছে শ্যাম রাই (badhiya duijone dui bhuj bondhone)

বাঁধিয়া দুইজনে দুঁহু ভুজ বন্ধনে কাঁদিছে শ্যাম রাই।
মিলনের মাঝে এত বেদনা যে বাজে গো 
 দেখি নাই, শুনি নাই॥
সাগরে মিশে নদী, তবু কাঁদে নিরবধি, বুঝি না কেন গো 

বুকে যত পায়, তত তৃষ্ণা বেড়ে যায়, সাধ মেটে না যেন গো॥
সাধ কি মেটে গো চাঁদকে হেরে চকোরিনীর সাধ কি মেটে গো 

মেঘ দেখে চাতকিনীর সাধ কি মেটে গো।
হের, নব নাগরি নব নাগর মাতিল প্রেম-রসে,
নব প্রভাত-কমলে যেন বন ভ্রমর বসে।
নব সোনার শতদলে যেন নব মেঘের ছায়া
কনকমালা ঘিরিল যেন বন নীল গিরি কায়া।
গিরিধারীরে ধরিল, ধিরিধিরি রাধা গিরিধারীরে ধরিল॥
আধ অধরে ধরে নাক' হাসি, আধ-অধরে বাঁশি,
হেরি' আধ অঙ্গ দাস হতে চায়, আধ অঙ্গ দাসী;
শ্রীচরণ ঘিরিয়া মন মধুকর গাহে, চরণাম্বুজ-রজ মাধুকরী চাহে॥
বলে, ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও 

ওই চরণ কমল-মধু ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও,
ঐ যুগল-রূপ রাধা-শ্যাম দেখি যেন অবিরাম (ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও)
আমি আনন্দ-যমুনা হয়ে, চরণ ধুয়ে যাব বয়ে, (ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও)
আমি নিত্য হৃদি-ব্রজধামে
হরিব মোর রাধা-শ্যামে, (ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও)॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে রাধা-কৃষ্ণের মহামিলনের মধ্যেও বিরহ, প্রেমের অতৃপ্তি এবং পরম ভক্তির গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এক অপূর্ব কাব্যিক রূপে উপস্থাপিতহয়েছে। কবি দেখিয়েছেন, সত্যিকারের প্রেমে মিলনই শেষ কথা নয়; বরং মিলনের মধ্যেও বিচ্ছেদের আশঙ্কা, প্রিয়কে আরও কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং অনন্ত প্রেমের তৃষ্ণা জাগ্রত থাকে।

    গানের শুরুতে রাধা ও কৃষ্ণ পরস্পরকে আলিঙ্গন করে অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন। বাহ্যত তাঁরা মিলিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের চোখে জল। এই চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি প্রেমের এক গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন- প্রকৃত প্রেমে মিলনও কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্তি এনে দেয় না। কারণ প্রেম সীমাহীন; যতই প্রিয়জনকে কাছে পাওয়া যায়, তাঁকে আরও গভীরভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ততই বৃদ্ধি পায়। তাই কবি বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, মিলনের মাঝেও এমন বেদনা আগে কখনও দেখা বা শোনা যায় নি।

    এরপর নদী ও সাগরের উপমার মাধ্যমে এই অতৃপ্ত প্রেমের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নদী সাগরে মিলিত হলেও তার প্রবাহ থেমে যায় না; তেমনি প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ও মিলনের পর স্থির হয়ে থাকে না। বরং ভালোবাসা যত গভীর হয়, একে অপরকে আরও সম্পূর্ণভাবে লাভ করার আকাঙ্ক্ষা তত প্রবল হয়ে ওঠে। একই ভাবকে আরও স্পষ্ট করতে কবি চকোরিনীর চাঁদের প্রতি আকর্ষণ এবং চাতকিনীর মেঘের প্রতীক্ষার উপমা দিয়েছেন। চাঁদকে দেখেও চকোরিনীর আকাঙ্ক্ষা শেষ হয় না; মেঘ দেখেও চাতকিনীর তৃষ্ণা মেটে না। অর্থাৎ সত্যিকার প্রেমের কোনো চূড়ান্ত পরিতৃপ্তি নেই; তার স্বভাবই হলো অনন্ত আকর্ষণ।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি রাধা-কৃষ্ণের যুগলসৌন্দর্যের এক অপরূপ চিত্র এঁকেছেন। তাঁদের মিলনকে নবপ্রভাতের প্রস্ফুটিত পদ্মে ভ্রমরের আসন গ্রহণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আবার সোনার শতদলের উপর নীল মেঘের ছায়ার মতো রাধার গৌরবর্ণ ও কৃষ্ণের শ্যামবর্ণের যুগল রূপ এক অনিন্দ্যসুন্দর বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। রাধার দ্বারা গিরিধারী কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করার চিত্র প্রেমের পূর্ণতা ও আত্মসমর্পণের প্রতীক। এরপর কবি সূক্ষ্মভাবে রাধা-কৃষ্ণের রূপমাধুর্য বর্ণনা করেছেন। কৃষ্ণের অধরে আধখানি হাসি, আবার সেই অধরেই বাঁশি। এই দৃশ্য দেখে ভক্তের হৃদয়ে এমন আকর্ষণ জাগে যে, সে কখনো কৃষ্ণের দাস, কখনো রাধার দাসী হয়ে তাঁদের সেবা করতে চায়। এখানে দাস ও দাসী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আসলে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও অহংকারবর্জিত ভক্তির প্রতীক।

    গানের শেষাংশে কবি নিজেকে এক ভিক্ষুক ভক্তরূপে কল্পনা করেছেন। তিনি কোনো পার্থিব সম্পদ চান না; তাঁর একমাত্র প্রার্থনা রাধা-কৃষ্ণের চরণকমলের মধুরস, অর্থাৎ তাঁদের কৃপা, প্রেম ও ভক্তি। তিনি চান, যুগলরূপ যেন তাঁর দৃষ্টিতে চিরকাল বিরাজ করে। তিনি আনন্দ-যমুনার মতো তাঁদের চরণ ধুয়ে বহমান থাকতে চান এবং নিজের হৃদয়কেই ব্রজধামে পরিণত করে সেখানে নিত্য রাধা-শ্যামকে অধিষ্ঠিত করতে চান। এই আকাঙ্ক্ষা ভক্তির সর্বোচ্চ আদর্শের পরিচয় বহন করে, যেখানে বাহ্যিক তীর্থ নয়, মানুষের হৃদয়ই ঈশ্বরের চিরবাসস্থান হয়ে ওঠে।

    সার্বিকভাবে, গানটি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে কেবল মানবীয় প্রেম হিসেবে নয়, জীবাত্মা ও পরমাত্মার চিরন্তন মিলনের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এখানে মিলনের মধ্যেও অতৃপ্তি প্রেমের অপূর্ণতা নয়; বরং প্রেমের অসীমতার পরিচয়। যুগলরূপের সৌন্দর্য, ভক্তির বিনয়, চরণসেবার আকাঙ্ক্ষা এবং হৃদয়কে ব্রজধামে রূপান্তরিত করার বাসনার মাধ্যমে কবি প্রেম ও ভক্তির এক উচ্চতম আধ্যাত্মিক দর্শন প্রকাশ করেছেন।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ২৮ ডিসেম্বর ১৯৪০ (শনিবার ১৩ পৌষ ১৩৪৭) কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে 'যুগল মিলন' গীতিচিত্র প্রচারিত হয়েছিল। এই গীতিচিত্রে এই গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৭ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ,[নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ৬৫৫। পৃষ্ঠা: ১৯৯ ]
    • নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, আটচল্লিশতম খণ্ড। স্বরলিপিকার: ইদ্‌রিস আলী। [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, কার্তিক ১৪২৬। নভেম্বর ২০১৯। পৃষ্ঠা:  ৬০-৬৭]  [নমুনা]
  • বেতার
    • যুগল মিলন (গীতিচিত্র)।
      • প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতার কেন্দ্র। [ ২৮ ডিসেম্বর ১৯৪০ (শনিবার ১৩ পৌষ ১৩৪৭)।  তৃতীয় অধিবেশন। ৮.০০-৮.৩৯।
      • সূত্র:
        • বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ২৪শ সংখ্যা।পৃষ্ঠা: ১৩৩৬
        • The Indian Listener 1941-Vol-V-24  page 1627
      • দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা বেতার কেন্দ্র [১৪ মার্চ ১৯৪২ (শনিবার ৩০ ফাল্গুন ১৩৪৮)। প্রচার সময়: রাত ৭.৩০।
        • সূত্র: The Indian Listener 1942-Vol-VII-5 page 83
  • রেকর্ড: এচএমভি [এপ্রিল ১৯৪২ (চৈত্র-১৩৪৮-বৈশাখ ১৩৪৯)। এন ২৭২৬৩। শিল্পী: ইলা ঘোষ। সুর: নজরুল ইসলাম]
    •  
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
    • ইদ্‌রিস আলী। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের [ শিল্পী: ইলা ঘোষ] সুরানুসারে স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি আটচল্লিশতম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [নমুনা]
       
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণ-লীলা
    • সুরাঙ্গ: কীর্তনাঙ্গ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।