বাঁশরি বাজে দূর বন মাঝে উদাস সুরে ঝুরে (bashori baje dur bon majhe)

বাঁশরি বাজে দূর বন মাঝে উদাস সুরে ঝুরে ঝুরে।
আয় আয় প্রেম-যমুনায় কূল ছেড়ে আয় আয় আয় আয় অকূলে॥
ত্যাজি’ সংসার দুঃখ জ্বালায়
জুড়াইতে আয় কৃষ্ণ-ছায়ায়
গোপ-গোপীর গোকুলে
কেউ হবি মাতা কেউ হবি পিতা
সখা হবি কেহ হবি কেহ পিতা
হবি কেহ প্রিয় প্রিয়া হবি কেহ নীপ তরুমূলে॥
কেহ দিবি চন্দন কেহ দিবি মালা
আনিবি কেহ পূজা-আরতির থালা
ব্রজধামে ভেদ নাই সকলের আছে ঠাঁই
ডাকে শোন্‌ শ্যামরায় আয় ওরে চ’লে আয় ঘর ভুলে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরকে কেন্দ্র করে সমগ্র মানবজাতির প্রতি প্রেম, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের এক সর্বজনীন আহ্বান ব্যক্ত হয়েছে। কবি কল্পনা করেছেন, দূর বনমাঝে কৃষ্ণের বাঁশি উদাস সুরে বেজে উঠেছে। এই বাঁশির ধ্বনি কেবল সংগীত নয়; এটি কৃষ্ণেরই আহ্বান, যা সংসারের মোহে আবদ্ধ মানুষকে কৃষ্ণপ্রেমের পথে ডেকে আনে। তাই তিনি সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন—সংসারের সীমাবদ্ধতার ‘কূল’ ছেড়ে প্রেম-যমুনার ‘অকূলে’, অর্থাৎ অসীম পরমসত্তার প্রেমের জগতে প্রবেশ করতে।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, সংসারের দুঃখ, ক্লেশ, মায়া ও অশান্তি ত্যাগ করে কৃষ্ণের স্নেহময় ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলেই প্রকৃত শান্তি লাভ করা যায়। এখানে ‘কৃষ্ণ-ছায়া’ ঈশ্বরের করুণা, সুরক্ষা ও অনন্ত আশ্রয়ের প্রতীক। ‘গোপ-গোপীর গোকুল’ কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি প্রেম, সরলতা, নিষ্কলুষতা ও কৃষ্ণসান্নিধ্যের এক আধ্যাত্মিক জগতের প্রতীক, যেখানে ভক্তি ও ভালোবাসাই একমাত্র পরিচয়।

    এরপর কবি দেখিয়েছেন, সেই ব্রজধামে প্রত্যেকের জন্য একটি না একটি স্থান নির্দিষ্ট রয়েছে। কেউ মায়ের স্নেহে, কেউ পিতার দায়িত্বে, কেউ বন্ধুর আন্তরিকতায়, কেউ প্রিয় বা প্রিয়ার প্রেমে, আবার কেউ নীপবৃক্ষের নীরব ছায়ার মতো কৃষ্ণসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবে। এই বিভিন্ন সম্পর্কের উল্লেখের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কৃষ্ণের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একরৈখিক নয়; মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ, বন্ধুত্ব, প্রেম কিংবা নিঃশব্দ সেবার মাধ্যমে—যে কোনো নির্মল সম্পর্কেই তাঁকে লাভ করা যায়।

    গানটির পরবর্তী অংশে ভক্তসেবার সহজ ও আন্তরিক রূপ ফুটে উঠেছে। কেউ চন্দন নিবেদন করবে, কেউ ফুলের মালা, কেউ পূজার আরতির থালা নিয়ে আসবে। এই উপহারগুলোর বাহ্যিক মূল্য নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত ভক্তিই প্রধান। এখানে পূজা কেবল আচার নয়; এটি হৃদয়ের নিবেদন ও প্রেমের প্রকাশ।

    গানের শেষাংশে কবি এক গভীর মানবতাবাদী ও আধ্যাত্মিক আদর্শ উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, ব্রজধামে কোনো ভেদাভেদ নেই; সেখানে জাতি, বর্ণ, ধন-দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক মর্যাদার কোনো পার্থক্য নেই। সকলের জন্যই সেখানে সমান আশ্রয় রয়েছে। শ্যামরায় সকলকে সমানভাবে আহ্বান করছেন—সংসারের ক্ষণস্থায়ী আসক্তি ভুলে তাঁর প্রেমের রাজ্যে চলে আসতে। এই আহ্বান আসলে আত্মার মুক্তি, সমতা, ভ্রাতৃত্ব এবং সর্বজনীন কৃষ্ণপ্রেমের আহ্বান।

    সার্বিকভাবে, গানটি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুরকে পরমসত্তার চিরন্তন আহ্বানের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সংসারের দুঃখ, বিভেদ ও সংকীর্ণতা অতিক্রম করে প্রেম, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে কৃষ্ণের সান্নিধ্যে পৌঁছানোর পথই এর মূল বার্তা। এখানে ব্রজধাম এক সর্বজনীন প্রেমলোক, যেখানে প্রত্যেক মানুষের জন্য স্থান রয়েছে এবং যেখানে ভক্তিই সকল পরিচয়ের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে এপ্রিল  (বৃহস্পতিবার ১৫ বৈশাখ ১৩৪৫) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুল ইসলামের একটি চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিপত্রের এই গানটির উল্লেখ ছিল। কিন্তু এই বছরে এই গানটির কোনো রেকর্ড প্রকাশিত হয় নি। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১১ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০৪৫।  পৃষ্ঠা: ৬১৬]
  • রেকর্ড: রেকর্ড কোম্পানির সাথে চুক্তি [২৮ এপ্রিল ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার ১৫ বৈশাখ, ১৩৪৫)]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।