বাঁশি তার কোথায় বাজে! (bashi tar kothay baje)
বাঁশি তার কোথায় বাজে!
বাজে মোর দহন-জ্বালায়, বাজে মোর ব্যাথার মাঝে॥
বাজে মোর মিলন-তৃষায়, না পাওয়াতে,
বাজে তার আসার-আশায়, পথ চাওয়াতে,
বাজে মোর রাতের ঘুমে, বাজে মোর দিনের কাজে॥
বাজে মোর অন্তরে গো বাজে মোর বাহির-দ্বারে,
বাজে মোর ব্রজের১ পথে, মথুরা২ কারাগারে।
সুরে যার গভীর প্রেমের পরশ লভি',
আঁকি গো কল্পনাতে যাহার ছবি,
সে কখন আঁখির আগে আস্বে চির-কিশোর সাজে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিকে কেন্দ্র করে এক ভক্তহৃদয়ের গভীর বিরহ, আকাঙ্ক্ষা ও কৃষ্ণপ্রেমের অনুভূতি উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে বাঁশির সুর কোনো বাহ্যিক সংগীতমাত্র নয়; এটি পরমপ্রিয়ের চিরন্তন আহ্বান, যা ভক্তের অন্তরজুড়ে অবিরাম অনুরণিত হয়। সেই সুর কখনো শ্রবণে নয়, বরং হৃদয়ের গভীর অনুভবে ধ্বনিত হয়।
গানের শুরুতেই কবি প্রশ্ন করেন- 'বাঁশি তার কোথায় বাজে?' এর উত্তরে তিনি নিজেই জানান, সেই বাঁশি বাইরের কোনো বনে নয়; তা তাঁর হৃদয়ের দহন, বেদনা ও অন্তর্দাহের মধ্যেই বাজে। অর্থাৎ প্রিয়জনের বিরহে যে অস্থিরতা ও ব্যথা জন্মায়, সেই বেদনাই যেন কৃষ্ণের বাঁশির প্রতিধ্বনি হয়ে অন্তরে ধ্বনিত হয়। এখানে দুঃখ ও প্রেম পরস্পরের পরিপূরক; বিরহই মিলনের আকাঙ্ক্ষাকে আরও গভীর করে তোলে।
এরপর কবি বলেন, বাঁশির সুর তাঁর মিলনের তৃষ্ণায়, প্রিয়কে না পাওয়ার যন্ত্রণায় এবং তাঁর আগমনের আশায় পথ চেয়ে থাকার প্রতিটি মুহূর্তে বেজে ওঠে। এই সুর তাঁর রাত্রির নিদ্রায় যেমন উপস্থিত, তেমনি দিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যেও বিরামহীনভাবে অনুরণিত হয়। অর্থাৎ ভক্তের সমগ্র জীবন, চিন্তা ও অনুভূতি কৃষ্ণস্মৃতিতে পরিপূর্ণ; এমন কোনো সময় নেই, যখন তিনি সেই আহ্বান থেকে বিচ্ছিন্ন।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি এই অনুভূতির সর্বব্যাপী রূপ তুলে ধরেছেন। বাঁশির ধ্বনি তাঁর অন্তরের গভীরে যেমন শোনা যায়, তেমনি বাহ্যজগতের প্রতিটি অভিজ্ঞতায়ও তিনি তার উপস্থিতি উপলব্ধি করেন। তাঁর কল্পনায় সেই সুর ব্রজের প্রেমময় পথেও বাজে, আবার মথুরার কারাগারেও বাজে। ব্রজ এখানে আনন্দময় মিলনের প্রতীক, আর মথুরার কারাগার বিচ্ছেদ, বেদনা ও বন্ধনের প্রতীক। অর্থাৎ সুখ-দুঃখ, মিলন-বিরহ—জীবনের প্রতিটি অবস্থাতেই কৃষ্ণস্মৃতি সমানভাবে বিরাজমান।
গানটির শেষাংশে কবি বলেন, সেই বাঁশির সুরে তিনি গভীর প্রেমের স্পর্শ অনুভব করেন। সেই প্রেমের আবেশে তিনি কল্পনার চিত্রপটে চিরকিশোর শ্রীকৃষ্ণের রূপ এঁকে চলেন। কিন্তু কল্পনার সেই রূপ কবে বাস্তব দর্শনে পরিণত হবে—এই আকাঙ্ক্ষাই তাঁর অন্তরের সবচেয়ে বড় সাধনা। তিনি অপেক্ষা করেন সেই মুহূর্তের জন্য, যখন কৃষ্ণ চিরকিশোর রূপে তাঁর সামনে আবির্ভূত হবেন এবং দীর্ঘদিনের বিরহের অবসান ঘটবে।
সার্বিকভাবে, গানটি ভক্তিরসের এক অনুপম প্রকাশ, যেখানে কৃষ্ণের বাঁশি পরমাত্মার অন্তর্যামী আহ্বানের প্রতীক। এই আহ্বান বাহ্যিক শ্রবণে নয়, প্রেমময় হৃদয়ের গভীরে ধ্বনিত হয়। বিরহ, প্রত্যাশা, স্মরণ, কল্পনা ও দর্শনলাভের আকাঙ্ক্ষা—এই সমস্ত অনুভূতির সমন্বয়ে গানটি দেখিয়েছে যে, সত্যিকার কৃষ্ণপ্রেম মানুষের সমগ্র জীবনকে আচ্ছন্ন করে রাখে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে পরমপ্রিয়ের প্রতীক্ষায় অর্থবহ করে তোলে।
- রচনাকাল : গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে আগষ্ট (মঙ্গলবার ১০ ভাদ্র ১৩৪৭) আকাশবাণী কলকাতার ত্রয়োদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম 'আকাশবাণী' নামক একটি 'গীতি-আলেখ্য' রচনা করেন। এই গীতি-আলেখ্যের জন্যই নজরুল এই গানটি রচনা করেছিলেন। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ১৬১২। পৃষ্ঠা ৪৮২]
- পত্রিকা: বেতার জগৎ। বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৭শ সংখ্যা। শিরোনাম: আকাশ-বাণীর গান। গান সংখ্যা ৫। পৃষ্ঠা: ২০।
- বেতার: আকাশবাণী (গীতিকা)
- প্রথম প্রচার: ২৬ আগষ্ট, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (মঙ্গলবার ১০ ভাদ্র ১৩৪৭)। কলকাতার খ। চতুর্থ অধিবেশন। সন্ধ্যা ৭.৪৫ থেকে ৮.২৯ মিনিট।
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৬শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৮৮৪
- The Indian-listener 1940, Vol V, No 16. page 1253
- সূত্র:
- দ্বিতীয় প্রচার: ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ (শনিবার ৯ ফাল্গুন ১৩৪৮)। কলকাতার খ। চতুর্থ অধিবেশন। সন্ধ্যা ৭.৩০ থেকে ৮.০৯।
- সূত্র: The Indian-listener 1942, Vol VII, No 4. page 51]
- প্রথম প্রচার: ২৬ আগষ্ট, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (মঙ্গলবার ১০ ভাদ্র ১৩৪৭)। কলকাতার খ। চতুর্থ অধিবেশন। সন্ধ্যা ৭.৪৫ থেকে ৮.২৯ মিনিট।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বিরহ