বাজিয়ে বাঁশি মনের বনে এসো কিশোর বংশীধারী। (bajiye bashi moner bone)


            রাগ: সুরট মিশ্র, তাল: দাস পয়রা
বাজিয়ে বাঁশি মনের বনে এসো কিশোর বংশীধারী।
চূড়ায় আঁধার ময়ূর-পাখা বামে লয়ে রাধাপ্যারী॥
            আমার আঁধার প্রাণের মাঝে
            এসো অভিসারের সাজে,
নয়ন-জলের যমুনাতে উজান বেয়ে ছুটুক বারি॥
এমনি চোখে তোমায় আমি দেখতে যদি না পাই হরি,
দেখাও পদ্মপলাশ আঁখি, তোমার প্রেমে অন্ধ করি’।
হরি হে, ঘুচাও এবার মায়ার বেড়ী,
            পরাও তিলক কলঙ্কেরি,
শ্যাম রাখি কি কুল রাখি’ ভাব শ্যাম হে আর সইতে নারি॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি শ্রীকৃষ্ণকে অন্তরের মন্দিরে আহ্বান জানিয়ে তাঁর প্রেম, করুণা ও আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য প্রার্থনা করেছেন। বাহ্যিক বৃন্দাবনের পরিবর্তে মানুষের অন্তরকেই তিনি প্রেমের বন বা "মনের বন" হিসেবে কল্পনা করেছেন, যেখানে কৃষ্ণের বাঁশির সুর ধ্বনিত হলে হৃদয় জাগ্রত হয়ে ওঠে এবং আত্মা ঈশ্বরপ্রেমে উদ্বেলিত হয়।

    গানের শুরুতে ভক্ত কৃষ্ণকে তাঁর চিরচেনা রূপে আহ্বান জানিয়েছেন—মাথায় ময়ূরপুচ্ছের মুকুট, বাম পাশে রাধা। এই রূপ কেবল পৌরাণিক নয়, প্রেম, সৌন্দর্য ও চিরন্তন মিলনের প্রতীক। ভক্তের কামনা, কৃষ্ণ যেন তাঁর হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে প্রেমের আলোয় জীবনকে উদ্ভাসিত করেন।

    এরপর কবি নিজের অন্তরের বেদনাকে "আঁধার প্রাণ" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি চান, কৃষ্ণ যেন অভিসারের সাজে তাঁর হৃদয়ে আবির্ভূত হন। ভক্তের নয়নের অশ্রুকে তিনি যমুনা নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেই অশ্রুধারা যেন উজান বেয়ে ছুটে চলে—অর্থাৎ বিরহ, ব্যাকুলতা ও প্রেমের তীব্র আবেগে হৃদয় ঈশ্বরের দিকে ধাবিত হয়। এখানে অশ্রু দুঃখের নয়, বরং ভক্তির গভীরতার প্রকাশ। পরবর্তী স্তবকে ভক্ত স্বীকার করেন যে, সাধারণ দৃষ্টিতে তিনি কৃষ্ণকে উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই তিনি প্রার্থনা করেন, কৃষ্ণ যেন তাঁর পদ্মপলাশ-নয়নের দর্শন দেন এবং নিজের প্রেমে তাঁকে এমনভাবে নিমগ্ন করেন, যাতে জাগতিক মোহ ও বিভ্রমের প্রতি তিনি অন্ধ হয়ে যান। এখানে "প্রেমে অন্ধ করা" বলতে পার্থিব আসক্তি থেকে মুক্ত করে কৃষ্ণপ্রেমে সম্পূর্ণ নিমগ্ন করে দেওয়াকেই বোঝানো হয়েছে।

    গানের শেষাংশে ভক্ত মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তির আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তিনি চান, কৃষ্ণ যেন তাঁর সমস্ত জাগতিক পরিচয় ও সামাজিক সংকোচ দূর করে নিজের প্রেমের চিহ্নে তাঁকে চিহ্নিত করেন। 'কলঙ্কের তিলক' বলতে সমাজের নিন্দা বা অপবাদকেও আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করার মানসিকতা বোঝানো হয়েছে, যদি তা কৃষ্ণপ্রেমের কারণে হয়। 'শ্যাম রাখি কি কুল রাখি'—এই উক্তিতে প্রেম ও সামাজিক মর্যাদার দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। ভক্তের কাছে শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণপ্রেমই সর্বোচ্চ; কুল-মর্যাদা বা লোকলজ্জার আর কোনো মূল্য থাকে না।

    গানটি ভক্তের আত্মনিবেদন, কৃষ্ণপ্রেম ও আধ্যাত্মিক মিলনের আকুল প্রার্থনার কাব্যগাঁথা। এখানে কৃষ্ণের বাঁশির সুর অন্তর্জাগরণের প্রতীক, অশ্রু ভক্তির প্রতীক, আর মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে শ্যামের প্রেমে আত্মসমর্পণই গানের মূল বক্তব্য। প্রেমের কাছে সামাজিক পরিচয়, লোকলজ্জা ও জাগতিক আসক্তি তুচ্ছ—এই চিরন্তন বৈষ্ণব ভাবধারাই গানের প্রাণ।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ ১৩৩৯) মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৭ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • গীতি-শতদল
      • প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। সুরট মিশ্র-দাসপয়রা]।
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৬৭। সুরট মিশ্র-দাসপয়রা। পৃষ্ঠা ৩২১]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০২১। রাগ: সুরট মিশ্র, তাল: দাস পয়রা। পৃষ্ঠা: ৬০৮]
  • রেকর্ড: মেগাফোন [জানুয়ারি ১৯৩৩ (পৌষ-মাঘ ১৩৩৯)]। জেএনজি ৩৮। শিল্পী: শ্রীমতী বীণাপাণি। শ্রেণি: কীর্তনাঙ্গ
  • বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
  • সুরকার: জ্ঞান দত্ত
  • পর্যায়
    • বিষয়াঙ্গ:  ধর্মসঙ্গীত। সনাতন ধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: কীর্তনাঙ্গ
    • রাগ: সুরট মিশ্র
    • তাল: তাল ফেরতা (কাহারবা- দাদরা)
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।