বিজন গোঠে কে রাখাল বাজায় বেণু (bijon gothe ke rakhal bajay benu)
বিজন গোঠে কে রাখাল বাজায় বেণু
আমি সুর শুনে তা'র বাউল হয়ে এনু (গো)॥
ঐ সুরে পড়ে মনে কোন্ সুদূর বৃন্দাবনে
যেত নন্দ-দুলাল ব্রজ-গোপাল বাজিয়ে বেণু বনে
পথ লুট্তো কেঁদে গোপবালা, ভুল্তো তৃণ-ধেণু গো
কেঁদে ভুলতো তৃণ-ধেণু॥
কবে নদীয়াতে গোরা
ও ভাই ডেকেছিল এম্নি সুরে এম্নি পাগল-করা।
কেঁদে ডাক্তো বৃথাই শচীমাতা, সাধ্তো বসুন্ধরা,
প্রেমে গ'লে যত নর-নারী যাচ্তো পদ-রেণু গো
তারা যাচ্তো পদ-রেণু॥
- ভাবসন্ধান: কৃষ্ণের বেণুর সুর এবং গৌরাঙ্গের প্রেমের আহ্বান একই পরম প্রেমের দুই প্রকাশ। সেই প্রেমের আকর্ষণ এত প্রবল যে, তা মানুষকে সংসারের স্বাভাবিক বন্ধন ও চেতনা থেকে টেনে নিয়ে আরাধ্য দেবতার চরণে সমর্পিত করে। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কোন এক রাখালের বাঁশির সুর শুনে কবির মনে জেগে ওঠা কৃষ্ণপ্রেম, বৃন্দাবনের স্মৃতি এবং গৌরাঙ্গপ্রেমের এক অপূর্ব সমন্বয়ে উপস্থাপিত পেয়েছে।
নির্জন গোঠে কোনো রাখাল যখন বাঁশি বাজায়, সেই সুর শুনে কবির মন আর স্থির থাকতে পারে না; তিনি সেই সুরের টানে যেন বাউল হয়ে ছুটে আসেন। বাঁশির সুর তাঁকে মনে করিয়ে দেয় সুদূর বৃন্দাবনের সেই নন্দদুলাল, ব্রজগোপাল কৃষ্ণকে—যিনি বনে বেণু বাজিয়ে গোপীদের হৃদয় মোহিত করতেন।
কৃষ্ণের বাঁশির সুর এতই আকর্ষণীয় ছিল যে, তা শুনে গোপবালিকারা নিজেদের স্বাভাবিক কর্তব্য ভুলে কৃষ্ণের দিকে ছুটে যেত। তারা পথের মধ্যে কান্নায় লুটিয়ে পড়ত, এমনকি তৃণভোজী ধেনুগুলিও ঘাস খাওয়া ভুলে সেই বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে থাকত। অর্থাৎ কৃষ্ণের বেণুর সুর মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের স্বাভাবিক চেতনা ও কর্মকে স্তব্ধ করে দিত।
এরপর কবির মনে পড়ে নদীয়ার গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর কথা। গৌরাঙ্গও এমনই পাগল-করা প্রেমের সুরে মানুষকে ডাকতেন। তাঁর বিচ্ছেদে শচীমাতা ব্যাকুল হয়ে কাঁদতেন; তাঁর প্রেমে যেন সমগ্র বসুন্ধরাও আকুল হয়ে উঠেছিল। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ সেই প্রেমে গলে গিয়ে তাঁর পদরেণু লাভের জন্য ছুটে যেত।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪০) মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ:
- গীতি-শতদল
- প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। বাউল]।
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৬৮। বাউল। পৃষ্ঠা: ৩২১-৩২২]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৩২১]
- গীতি-শতদল
- রেকর্ড: এইচএমভি। [ জুলাই ১৯৩৩ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪০)। এন ৭১২২L শিল্পী: ধীরেন্দ্রনাথ দাস। । [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর। [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড (নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)] ১৯ সংখ্যক গান [নমুনা]
- পর্যায়: