বুঝি চাঁদের আর্শিতে মুখ দেখেছে (bujhi chader arshite mukh dekhechhe)

বুঝি চাঁদের আর্শিতে মুখ দেখেছে কালো মেয়ে কালিকা।
তারার নূপুর তাই ছড়িয়ে ফেলেছে নীল আকাশে বালিকা॥
অভিমানে তাই বাঁধে না কেশ
ধরেছে সে সংহারিণী বেশ,
চণ্ডী হয়ে মুণ্ডুমালা পরেছে ফেলে ফুলের মালিকা॥
যত বলি তুই কালো নস গোরী গো মুখ মেখেছিস কাজলে
উমা ততই শ্যামা হয়ে ঢাকে মুখ কৃষ্ণা তিথির আঁচলে।
মোরা বুঝি তেমনি দেখি মায়া
আলোর দেহে মিথ্যা কালোর ছায়া
তোর এ কালোর খেলা এবার ভোলা মা বিশ্বভুবন-পালিকা॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে দেবী কালী ও উমার অভিন্ন সত্তা এবং বাহ্যিক রূপের আড়ালে নিহিত চিরসুন্দরের উপলব্ধি অত্যন্ত কাব্যিক ও দার্শনিক ব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করা হয়েছে। মানুষের দৃষ্টিতে কালী ভয়ংকর ও কৃষ্ণবর্ণা হলেও কবির উপলব্ধিতে তিনি আদ্যাশক্তি, বিশ্বজননী এবং পরম মঙ্গলময়ী। তাঁর কালো রূপ আসলে মহামায়ার এক লীলা মাত্র।

    গানের সূচনায় কবি কল্পনা করেছেন, যেন কালী চাঁদের আয়নায় নিজের মুখ দেখে অভিমান করেছেন। সেই অভিমানে তিনি তারার নূপুর খুলে নীল আকাশে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এটি একটি চমৎকার কাব্যিক চিত্রকল্প। এখানে আকাশের অসংখ্য তারাকে দেবীর নূপুরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আর তাঁর অভিমানকে প্রকৃতির রূপমাধুর্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।

    এরপর কবি বলেন, অভিমানে দেবী আর কেশ বাঁধেন না; তিনি সংহারিণী চণ্ডীর রূপ ধারণ করেছেন। ফুলের কোমল মালা ত্যাগ করে গলায় ধারণ করেছেন মুণ্ডমালা। এই রূপ দেবীর ভয়ংকর দিকের প্রতীক হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—তিনি অশুভ, অহংকার ও অসুরশক্তিকে বিনাশ করে ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি অত্যন্ত স্নেহভরে দেবীকে সম্বোধন করে বলেন—“তুই কালো নস, গোরী গো, মুখ মেখেছিস কাজলে।” অর্থাৎ দেবীর প্রকৃত স্বরূপ কালো নয়; তাঁর গৌরবর্ণ সৌন্দর্য যেন কেবল কাজলের প্রলেপে আচ্ছন্ন হয়েছে। দেবী উমা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রাতের আঁচলে নিজের মুখ ঢেকে শ্যামা রূপ ধারণ করেছেন। এখানে উমা ও কালী যে একই দেবী, সেই তত্ত্বই কাব্যিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

    গানের শেষাংশে কবি গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, মানুষের চোখে যে কালো রূপ দেখা যায়, তা আসলে মায়ার সৃষ্টি। দেবীর প্রকৃত দেহ আলো ও চৈতন্যময়; কালো রূপ কেবল সেই আলোর উপর পড়া এক ছায়া। তাই কবির আকাঙ্ক্ষা—এবার মা তাঁর এই কালোর লীলা শেষ করে বিশ্বপালিকা, বিশ্বজননীর প্রকৃত মঙ্গলময় রূপে আবির্ভূত হোন। 

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ২০৩১ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬১১।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু। শাক্ত। দুর্গা। দ্বৈতসত্তা: কালী ও উমা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।