বৃন্দাবনী কুমকুম আবির রাগে (brindaboni kumkum abir rage)

বৃন্দাবনী কুমকুম আবির রাগে যেন মোন অন্তর বাহির রাঙ্গে॥
            রস-যমুনা যেন বহে
            কভু মধুর মিলনে কভু বিধুর বিরহে,
রস-তৃষাতুরা ব্রজ-নাগরী যেন গাগরীতে সেই রস মাগে॥
যেন মোর কুঞ্জ-দুয়ারে,
ভাব-বিলাসিনী শ্রীমতী আসে অভিসারে।
                যেন মোর নিবিড় ধ্যানে
                মুরলী-ধ্বনি শুনি কানে,
বিরহের বরষায় আশা-নীপ-শাখায় যেন ঝুলনের দোলা লাগে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণ-প্রেমে উদ্বেলিত এক ভক্তহৃদয়ের অন্তর্জাগতিক অনুভূতি প্রকাশ করেছেন কবি। বৃন্দাবনের প্রেমলীলা, রাধাকৃষ্ণের মিলন-বিরহ এবং ভক্তিরসকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, ভক্তের মন যেন নিজেই এক নতুন বৃন্দাবনে পরিণত হয়। এখানে বাহ্যিক বৃন্দাবনের চেয়ে অন্তরের বৃন্দাবনই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

    গানের শুরুতেই কবি প্রার্থনা করেছেন, বৃন্দাবনের কুমকুম ও আবিরের রঙে তাঁর অন্তর ও বাহির রঞ্জিত হোক। এখানে কুমকুম ও আবির কেবল উৎসবের রং নয়; এগুলো কৃষ্ণপ্রেম, ভক্তির আনন্দ ও আত্মার পবিত্রতার প্রতীক। কবির আকাঙ্ক্ষা, তাঁর সমগ্র সত্তা যেন ঐশী প্রেমের রসে রঞ্জিত হয়ে ওঠে। এরপর তিনি কল্পনা করেন, তাঁর হৃদয়ে যেন রস-যমুনা প্রবাহিত হচ্ছে। কখনো সেই স্রোত মিলনের আনন্দে মধুর, আবার কখনো বিরহের বেদনায় বিষণ্ন।

    রাধাকৃষ্ণের প্রেমে যেমন মিলন ও বিরহ উভয়ই সমানভাবে রসময়, তেমনি ভক্তের জীবনেও ঈশ্বরের সান্নিধ্য ও বিচ্ছেদের অনুভূতি ভক্তিকে আরও গভীর করে তোলে। ব্রজের প্রেমাতুর গোপীদের মতো তিনিও সেই অমৃতরস লাভের জন্য ব্যাকুল।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি অনুভব করেন, তাঁর হৃদয়-কুঞ্জের দ্বারে যেন ভাববিলাসিনী শ্রীমতী রাধা অভিসারে এসে দাঁড়িয়েছেন। এই অভিসার বাহ্যিক কোনো ঘটনা নয়; এটি ভক্তির গভীর ধ্যানের মধ্যে প্রেমস্বরূপা রাধার আবির্ভাবের প্রতীক। সেই ধ্যানাবস্থায় কবি যেন কৃষ্ণের মুরলীর সুর শ্রবণ করেন, যা তাঁর অন্তরকে প্রেম ও আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

    গানের শেষাংশে কবি বলেন, বিরহের বর্ষাকালেও তাঁর হৃদয়ে আশা মরে যায় না। বরং সেই বিরহের বৃষ্টিধারায় আশার নীপশাখায় ঝুলনের দোলা লাগে। অর্থাৎ বিচ্ছেদও তাঁর কাছে হতাশার কারণ নয়; বরং তা ভবিষ্যৎ মিলনের প্রত্যাশাকে আরও সজীব ও গভীর করে তোলে। যেমন বর্ষাকালে বৃন্দাবনে ঝুলনযাত্রা প্রেম ও মিলনের উৎসবের বার্তা বহন করে, তেমনি বিরহের মধ্যেও ভক্তের হৃদয়ে মিলনের আশার দোলনা দুলতে থাকে।

    অতএব, এই গানে শ্রীকৃষ্ণ-প্রেমের আধ্যাত্মিক রস, রাধার অভিসার, মিলন-বিরহের চিরন্তন সৌন্দর্য এবং ভক্তহৃদয়ে অন্তর্বৃন্দাবনের জাগরণ অত্যন্ত মাধুর্যময় ও কাব্যিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এখানে প্রেম, বিরহ ও ভক্তি—তিনটিই পরস্পরকে পরিপূর্ণ করে কৃষ্ণলাভের এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে।
     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল  (শনিবার ২৪ চৈত্র ১৩৪৬), গানটি প্রথম সারঙ্গ রঙ্গ গীতি আলেখ্যের সাথে প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ১০ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুলগীতি-অখণ্ড,হরফ। নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ১৫৮৮ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৪৭৬।
     
  • বেতার:
    • সারঙ্গ রঙ্গ (গীতি আলেখ্য. সারঙ্গ অঙ্গের রাগভিত্তিক অনুষ্ঠান)                
      • প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ৬ এপ্রিল ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (শনিবার ২৪ চৈত্র ১৩৪৬), সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৭.১৫-৭.৫০ মিনিট।
          [সূত্র: বেতার জগৎ-এর ১১শ বর্ষ, ৭ম সংখ্যা অনুষ্ঠান সূচী। পৃষ্ঠা: ৩৪০, ৩৬৯]
      • তৃতীয় প্রচার: ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ (রবিবার, ৩ ফাল্গুন ১৩৪৮)। কলকাতা বেতার কেন্দ্র-১। তৃতীয় অধিবেশন। ৭.৪৫-৮.২৯।
            সূত্র:  The Indian listener. Vol VII. No 3, page 79
  • পর্যায়:

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।