ব্যথিত প্রাণে দানো শান্তি, চিরন্তন, ধ্রুব-জ্যোতি। (byathito prane dano shokti)

      ব্যথিত প্রাণে দানো শান্তি, চিরন্তন, ধ্রুব-জ্যোতি।
      দুখ-তাপ-পীড়িত-শোকার্ত এই চিত যাচে তব সান্ত্বনা ত্রিভুবন-পতি॥
      বেদনা যাতনা ক্লেশ মুক্ত কর, বিপদ নিবার, সব বিঘ্ন হর,
      আঁধার পথে তুমি হাত ধরো, প্রভু অগতির গতি॥
      সকল গ্লানি হতে হে নাথ বাঁচাও, চিত্তে অটল প্রসন্নতা দাও
যেন সুখে ও দুখে সদানন্দে থাকি, অবিচল থাকে যেন তব পদে মতি॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানেএক দুঃখক্লিষ্ট ভক্তের কণ্ঠে পরমসত্তার কাছে শান্তি, শক্তি, সাহস ও আত্মিক স্থিতির প্রার্থনা ব্যক্ত করেছেন। জীবনের নানা দুঃখ, ক্লেশ ও বিপদের মধ্যে ঈশ্বরই একমাত্র আশ্রয়—এই বিশ্বাসই গানের মূল সুর।

    গানের শুরুতেই কবি পরমেশ্বরকে চিরন্তন, ধ্রুবজ্যোতি বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ তিনি সেই অনন্ত আলোকস্বরূপ, যিনি কখনও নিভে যান না এবং সর্বদা সত্য ও কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেন। দুঃখ, তাপ, পীড়া ও শোকে বিদীর্ণ ভক্তের মন তাঁর কাছেই শান্তি ও সান্ত্বনা প্রার্থনা করে। এখানে ত্রিভুবন-পতি হিসেবে পরমসত্তাকে সমগ্র বিশ্বজগতের পালনকর্তা ও আশ্রয়দাতা রূপে চিত্রিত করা হয়েছে।

    গানের পরবর্তী অংশে ভক্ত প্রার্থনা করেন, পরমসত্তা যেন তাঁর জীবনের সমস্ত বেদনা, যাতনা ও ক্লেশ দূর করেন, সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন এবং জীবনের পথে আসা সমস্ত বিঘ্ন অপসারণ করেন। মানুষের জীবনপথ যখন অন্ধকার ও অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন তিনি যেন স্নেহভরে হাত ধরে সঠিক পথ দেখান। তাই কবি তাঁকে “অগতির গতি” বলে অভিহিত করেছেন—যিনি নিরাশ্রয় ও অসহায় মানুষের একমাত্র ভরসা।

    গানের শেষাংশে কবির প্রার্থনা আরও গভীর আধ্যাত্মিক রূপ লাভ করেছে। তিনি কেবল বাহ্যিক সুখ বা দুঃখ থেকে মুক্তি চান না; বরং অন্তরের গ্লানি, দুর্বলতা ও অস্থিরতা থেকে মুক্তি কামনা করেন। তিনি চান পরমসত্তা তাঁর চিত্তে এমন এক অটল প্রশান্তি দান করুন, যাতে জীবনের সুখে অহংকার না জন্মায়, আবার দুঃখেও মন ভেঙে না পড়ে। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা—সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থাতেই পরমসত্তার প্রতি অবিচল থাকা এবং তাঁর চরণে অটুট ভক্তি বজায় রাখা।

    মূলত এই গানে মানুষের জীবনের অনিবার্য দুঃখ ও সংকটের মধ্যে পরমাত্তার করুণা, অন্তরের শান্তি, মানসিক স্থৈর্য এবং অবিচল ভক্তিলাভের আন্তরিক প্রার্থনা অত্যন্ত সরল, গভীর ও আধ্যাত্মিক ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এর মূল শিক্ষা হলো—জীবনের প্রকৃত শান্তি দুঃখহীনতায় নয়, বরং পরমসত্তার প্রতি অটল বিশ্বাস, অন্তরের প্রসন্নতা এবং সুখ-দুঃখে সমভাব বজায় রাখার মধ্যেই নিহিত।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩) মাসে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৩৭]
  • রেকর্ড: এইচএমভি। অক্টোবর ১৯৩৬ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩)। এন ৯৭৮৯। শিল্পী: পারুল সেন। [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: রশিদুন্ নবী । নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (দশম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ, ৩ ফাল্গুন, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দ। ১৯ সংখ্যক  গান] [নমুনা]
  • পর্যায়
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। পরমসত্তা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
    • তাল: কাহারবা
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।