ব্রজগোপাল শ্যাম সুন্দর (brojogopal shyam shundor)
ব্রজগোপাল শ্যাম সুন্দর
যশোদা দুলাল শিশু নটবর॥
নন্দ নন্দন নয়নানন্দ
চরণে মধুর সৃজন ছন্দ
ভুবন মোহন কৃষ্ণচন্দ্র
অপরূপ রূপ হেরে চরাচর॥
কোটি গ্রহতারা চরণে নূপুর
ওঙ্কার ধ্বনি বাঁশরির সুর।
বঙ্কিম আঁখি বাঁকা শিখীপাখা
বাঁকা শ্রীচরণ ভঙ্গিমা বাঁকা
কৃষ্ণময় শ্রীঅঙ্গ ডাকা
করাল মধুর প্রভু গিরিধর॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের বাল্যরূপ, বিশ্বরূপ এবং লীলাময় ঐশীরূপ—এই তিনটি দিককে একসূত্রে গেঁথে বন্দনা করেছেন। একদিকে তিনি যশোদার স্নেহের শিশু, অন্যদিকে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি। এই দ্বৈত রূপই গানের প্রধান সৌন্দর্য।
গানের শুরুতেই কবি কৃষ্ণকে ব্রজগোপাল, শ্যামসুন্দর, যশোদার দুলাল এবং শিশু নটবর বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ তিনি ব্রজের রাখালবালক, যশোদার স্নেহের সন্তান এবং অপরূপ লীলাবিলাসী। তাঁর শৈশবের সরলতা ও দুষ্টুমির মধ্যেও ঈশ্বরীয় সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে। এরপর কবি বলেন, কৃষ্ণ নন্দের আনন্দ, সকলের নয়নের পরম সুখ। তাঁর চরণের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সৃষ্টির ছন্দ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ বিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্য, সুর ও সামঞ্জস্য তাঁরই লীলার প্রকাশ। তিনি ভুবনমোহন কৃষ্ণচন্দ্র—তাঁর অতুলনীয় রূপ দেখে সমগ্র চরাচর মুগ্ধ হয়ে যায়।
গানটির পরবর্তী অংশে কবির কল্পনা আরও মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র যেন কৃষ্ণের চরণের নূপুর, আর তাঁর বাঁশির সুর যেন ওঁকারের মহাধ্বনি। এখানে কৃষ্ণের বাঁশিকে কেবল সংগীতের উৎস নয়, বরং সমগ্র সৃষ্টির আদিস্পন্দনের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ যে আদিধ্বনি থেকে বিশ্বসৃষ্টি, সেই চিরন্তন নাদই কৃষ্ণের মুরলীতে অনুরণিত হয়।
গানটির শেষাংশে কবি কৃষ্ণের বঙ্কিম বা বাঁকা রূপের গভীর তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। তাঁর বাঁকা চাহনি, শিখিপাখা, ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়ানো শ্রীচরণ—সবকিছুই অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের প্রকাশ। এই বাঁকাভাব কেবল শারীরিক ভঙ্গি নয়; এটি প্রেম, লীলা ও মাধুর্যের প্রতীক। কৃষ্ণের সমগ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন প্রেমের আহ্বানে মুখরিত। তিনি একই সঙ্গে করাল ও মধুর—অর্থাৎ অসুরের প্রতি তিনি ভয়ংকর, কিন্তু ভক্তের প্রতি অসীম স্নেহময়। তাই তিনি গিরিধর, যিনি গোবর্ধন পর্বত ধারণ করে ভক্তদের রক্ষা করেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪২) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ৮০২।
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [মে ১৯৩৬ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৩)। এন ৯৭১৪। শিল্পী নীলমণি সিংহ। রাগ: তিলং] [শ্রবণ নমুনা]
- ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার, ১৩ মাঘ ১৩৪৩) এইচএমভি'র সাথে নজরুলের যে চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে গানটি ছিল।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: নিখিলরঞ্জন নাথ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, তেইশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। কার্তিক ১৪০৯ নভেম্বর ২০০২ খ্রিষ্টাব্দ] ২০ সংখ্যক গান [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল: একতাল
- গ্রহস্বর: সা