ব্রজ-বনের ময়ূর! (brojo boner moyur)
ব্রজ-বনের ময়ূর! বল কোন্ বনে শ্যামের নূপুর বাজে।
ওরে গোঠের ধেনু! কোথায় বাজে বেণু (মোরে) নিয়ে চল সেই বনের মাঝে॥
ওরে নীপ-বন বল্ কোথা লুকালো শ্যামল?
বল্ যমুনার জল কই মোর চঞ্চল?
বল্ লুকালি কোথায় ওরে রাখাল আমার রাখাল-রাজে॥
ওরে কৃষ্ণ-ব্রমর বল্ করুণা করি’
কোন্ কুঞ্জে রহে মোর কিশোর হরি?
ওগো মাধবী লতা মম মাধব কোথা
কোথা মদন-মোহন বল ব্রজ-নাগরী।
যদি দেবে না দেখা সেই কলঙ্কী চাঁদ
কেন ঘর ভুলালো পেতে মোহন ফাঁদ
কেন আনিল ব্রজে ভিখারিনী সাজে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি শ্রীকৃষ্ণ-বিরহে ব্যাকুল রাধার আকুল অনুসন্ধান ও প্রেমের গভীর বেদনাকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে রাধা সমগ্র বৃন্দাবনের প্রকৃতিকে প্রশ্ন করছেন; কারণ তাঁর বিশ্বাস, বৃন্দাবনের প্রতিটি বৃক্ষ, লতা, পশু-পাখি ও নদী কৃষ্ণের সঙ্গ লাভ করেছে। তাই তারা নিশ্চয়ই জানে তাঁর প্রিয়তম কোথায় আছেন।
গানের শুরুতেই রাধা বৃন্দাবনের ময়ূরকে জিজ্ঞাসা করেন, কোন বনে আজ কৃষ্ণের নূপুরধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এরপর তিনি গোঠের ধেনুদের অনুরোধ করেন, তারা যেন তাঁকে সেই বনের পথে নিয়ে যায়, যেখানে কৃষ্ণের বাঁশির সুর বাজছে। এখানে ময়ূর, ধেনু ও বাঁশির ধ্বনি—সবই কৃষ্ণের সান্নিধ্যের প্রতীক। রাধার মনে হয়, প্রকৃতির সকলেই যেন তাঁর চেয়ে কৃষ্ণের অধিক ঘনিষ্ঠ।
গানটির পরবর্তী অংশে তিনি নীপবন, যমুনার জল এবং বৃন্দাবনের প্রকৃতিকে প্রশ্ন করেন—তাঁদের প্রিয় রাখাল, সেই রাখাল-রাজ কোথায় লুকিয়ে আছেন। যমুনার জলও তাঁর কাছে আর নিছক নদীর জল নয়; সেখানে কৃষ্ণের পদচিহ্ন ও স্মৃতির স্পর্শ রয়েছে। তাই প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানই তাঁর কাছে কৃষ্ণের সন্ধানের সম্ভাব্য সাক্ষী। এরপর রাধা কৃষ্ণবর্ণ ভ্রমর, মাধবীলতা এবং ব্রজের নাগরীদের কাছে করুণ আবেদন জানান, তাঁরা যেন তাঁর কিশোর হরির ঠিকানা বলে দেন। এখানে ভ্রমর কৃষ্ণের শ্যামবর্ণ রূপের প্রতীক, আর মাধবীলতা নামের মধ্যেই "মাধব"-এর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। রাধার কাছে প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্যই কৃষ্ণের স্মৃতি বহন করে এবং তাঁকে আরও ব্যাকুল করে তোলে।
গানটির শেষাংশে রাধার বিরহবেদনা অভিমানে রূপ নেয়। তিনি বলেন, যদি কৃষ্ণ আর দর্শন না দেন, তবে কেন তিনি তাঁর মোহন রূপ ও প্রেমের ফাঁদে তাঁকে আবদ্ধ করলেন? কেন তিনি রাধাকে সংসার ভুলিয়ে বৃন্দাবনে এনে এক প্রেমভিখারিণীতে পরিণত করলেন? এখানে 'কলঙ্কী চাঁদ' বলে কৃষ্ণকে সম্বোধন করার মধ্যে অভিযোগ থাকলেও তা গভীর প্রেমেরই প্রকাশ। সমাজের চোখে রাধা কলঙ্কিনী হয়েছেন কৃষ্ণপ্রেমের জন্য; তবু সেই প্রেম ত্যাগ করার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। এই অভিমানও আসলে প্রেমেরই আরেকটি রূপ।
মূলত এই গানে শ্রীকৃষ্ণ-বিরহে রাধার অন্তহীন অনুসন্ধান, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের সংলাপ, প্রেমের আকুলতা, অভিমান এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের অনুভূতি অত্যন্ত কাব্যিক ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। গানের মূল ভাব হলো- সত্যিকারের প্রেমে প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতেও তাঁর স্মৃতি সমগ্র বিশ্বজগতকে আচ্ছন্ন করে রাখে; তখন প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুই প্রিয়তমের সন্ধান ও স্মৃতির বাহক হয়ে ওঠে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে কিছু রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের কোন মাসে প্রকাশিত হয়েছিল, তা জানা যায় নি।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ২০৪৭। পৃষ্ঠা ৬৪৭]
- রেকর্ড: মেগাফোন [১৯৪০ (১৩৪৬-১৩৪৭)। শ্রেণি: ভজন। মিশ্র দেশ-কাহারবা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বিরহ