ব্রজবাসী মোরা এসেছি মথুরা (brojobashi mora eshechhi mothura)
ব্রজবাসী মোরা এসেছি মথুরা, দ্বার ছেড়ে দাও দ্বারী।
মথুরার রাজা হ’য়েছে মোদের কানাই গোঠ বিহারী॥
রাজ-দণ্ড কেমন মানায় শোভিত যে হাতে বাঁশি
মুকুট মাথায় কেমন দেখায় শিরে শিখী-পাখা ধারী॥
শ্যামলী ধেনুর দুগ্ধের নবনী, যশোদা-নিশীথ জাগিয়া,
বনমালী লাগি নব-নীপ-মালা আনিয়াছি হের গাঁথিয়া,
কুড়ায়ে এনেছি ফেলে এসেছিল যে বাঁশরি বনচারী॥
ব্রজের দুলাল রাখাল ব’সেছে রাজার আসন পরে,
সারা গোকুলের এনেছি আশিস তাইরে তাহার তরে।
পাঠায়েছে গোপী-চন্দন তাই রাই অনুরাগ ভরে
(পাঠায়েছে রাই অনুরাগ ভরা গোপী চন্দন,
পাঠায়েছে রাই হরির লাগিয়া হরি চন্দন।)
নয়ন-যমুনা ছানিয়া এনেছি আকুল অশ্রুবারি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মথুরায় রাজা হওয়ার পর শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে আসা ব্রজবাসীদের হৃদয়ের স্নেহ, গর্ব, বিরহ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্রজবাসীদের কাছে কৃষ্ণ কোনো রাজা নন; তিনি আজও সেই গোকুলের রাখাল কানাই। তাই তাঁরা রাজদরবারে এসেও রাজাকে নয়, নিজেদের প্রিয় কানাইকেই খুঁজে বেড়ান।
গানের শুরুতেই ব্রজবাসীরা মথুরার প্রাসাদের দ্বাররক্ষীকে অনুরোধ করে বলেন—দ্বার খুলে দাও; আমরা ব্রজবাসীরা আমাদের কানাইকে দেখতে এসেছি। মথুরাবাসীর কাছে তিনি রাজা হলেও, ব্রজবাসীর কাছে তিনি আজও গোঠে গরু চরানো সেই স্নেহের রাখাল। এই সম্বোধনের মধ্যেই রাজশক্তির চেয়ে হৃদয়ের সম্পর্কের মূল্য অধিক বলে প্রতিফলিত হয়েছে। এরপর তাঁরা বলেন, যে হাতে বাঁশি শোভা পায়, সেই হাতে রাজদণ্ড মানায় না; যে মাথায় শিখিপাখা মানায়, সেখানে রাজমুকুটও যেন বেমানান। এই কথার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, তাঁদের কাছে কৃষ্ণের প্রকৃত পরিচয় রাজা নয়; তিনি প্রেম, সরলতা ও লীলার প্রতীক। ব্রজবাসীরা তাঁকে রাজসিক ঐশ্বর্যে নয়, তাঁর সহজ-সরল রাখালরূপেই দেখতে চান।
গানটির পরবর্তী অংশে তাঁরা ব্রজের ভালোবাসার উপহার হিসেবে এনেছেন- যশোদার হাতে তৈরি শ্যামলী ধেনুর দুধের নবনী (মাখন), বনের নতুন নীপফুলের মালা এবং বৃন্দাবনে ফেলে যাওয়া সেই পুরনো বাঁশিটি তাঁরা সঙ্গে এনেছেন। এগুলো কেবল উপহার নয়; কৃষ্ণের শৈশব, তাঁর লীলাভূমি এবং ব্রজবাসীর সীমাহীন স্নেহের স্মারক। তাঁরা যেন কৃষ্ণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চান—তাঁর প্রকৃত পরিচয় ও শিকড় কোথায়।
এরপর ব্রজবাসীরা বলেন, আজ ব্রজের রাখাল রাজার সিংহাসনে বসেছেন, তাই সমগ্র গোকুলের আশীর্বাদ তাঁরা তাঁর জন্য নিয়ে এসেছেন। রাধাও তাঁর জন্য গোপী-চন্দন ও অনুরাগভরা হরিচন্দন পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ কৃষ্ণ যত দূরেই থাকুন না কেন, রাধার প্রেম এবং ব্রজবাসীর স্নেহ কখনও তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি।
গানের শেষ পঙ্ক্তিতে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী চিত্র ফুটে ওঠে। ব্রজবাসীরা বলেন, তাঁরা নয়ন-যমুনা ছেঁকে আকুল অশ্রুজল নিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ তাঁদের চোখের জলই আজ কৃষ্ণের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। এই অশ্রু বিচ্ছেদের বেদনার হলেও, তার মধ্যে রয়েছে গভীর ভালোবাসা, আশীর্বাদ এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা।
এই গানে মূলত- ব্রজবাসীদের কাছে মথুরার রাজা কৃষ্ণ ও বৃন্দাবনের রাখাল কানাই—এই দুই পরিচয়ের মধ্যে তাঁদের প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজ্য, ঐশ্বর্য ও ক্ষমতার চেয়ে যশোদার স্নেহ, রাধার অনুরাগ, গোপ-গোপীদের ভালোবাসা এবং বৃন্দাবনের সরল জীবনই কৃষ্ণের প্রকৃত ঐশ্বর্য— এই সত্যই গানের মূল প্রতিপাদ্য। ব্রজবাসীদের অশ্রুসিক্ত নিবেদনের মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, সত্যিকারের প্রেম কখনও স্থান, কাল বা অবস্থানের পরিবর্তনে ম্লান হয় না; তা চিরকাল হৃদয়ের বন্ধন হয়ে থাকে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪০) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দ। ২৩৫ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬১২।
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪০)। এইচটি ৫১। শিল্পী ধীরেন দাস ও ইন্দুবালা। শিরোনাম: মথুরার দ্বারে]
- টুইন [জুলাই ১৯৩৫ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪২)। এফটি ৪০১৯ । শিল্পী: ইন্দুবালা]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- আহসান মুর্শেদ। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, তেপান্নতম খণ্ড, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, আশ্বিন ১৪২৮। সেপ্টেম্বর ২০২১] গান সংখ্যা ১৬। পৃষ্ঠা: ৬২-৬৭ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বিরহ
- সুরাঙ্গ: কীর্তন
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: মর