ব্রজের দুলাল ব্রজে আবার আসবে ফিরে কবে (brojer dulal broje abar ashbe fire kobe)
ব্রজের দুলাল ব্রজে আবার আসবে ফিরে কবে?
জাগবে কি আর ব্রজবাসী ব্যাকুল বেণুর রবে?
বাজবে নূপুর তমাল-ছায়ায়
বেইবে উজান হৃদ্-যমুনায়,
অভাগিনী রাধার কি আর তেমন সুদিন হবে? সখী গো!
গোঠে নাহি যায় রাখালেরা আর লুটায়ে কাঁদে পথে ধূলায়,
ধেনু ছুটে যায় মথুরা পানে না হেরি গোঠে রাখাল-রাজায়।
উড়িয়া গিয়াছে শুক-সারি পাখি শুনি না কৃষ্ণ-কথা (আর),
শ্যাম-সহকার তরুরে না-হেরি শুকালো মাধবী-লতা।
শ্যাম বিনে নাই সে শ্যাম-কান্তি, শুকায়েছে সব।
কদম তমাল তরু পল্লব হাসি উৎসব শুকায়েছে সব! সখি গো-
চির-বসন্ত ছিল যথা আজ সেথা শূন্যতা হাহাকার রবে কাঁদে শ্যাম (হে)
ললিতা বিশাখা নাই, নাই চন্দ্রাবলী নাই ব্রজে শ্রীদাম সুদাম। (সখী গো)
- ভাবসন্ধান:এই গানে শ্রীকৃষ্ণের মথুরাগমনের পর বৃন্দাবনের গভীর শূন্যতা, রাধার বিরহ এবং সমগ্র ব্রজবাসীর হৃদয়বিদারক বেদনার চিত্র অঙ্কন করেছেন। এখানে কেবল একজন প্রিয়জনের অনুপস্থিতির কথা নয়; বরং কৃষ্ণের বিদায়ে সমগ্র বৃন্দাবনের প্রাণশক্তি, আনন্দ ও সৌন্দর্য যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।
গানের শুরুতেই এক সখী ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করেন- ব্রজের দুলাল কৃষ্ণ আবার কবে বৃন্দাবনে ফিরে আসবেন? তাঁর ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কি আবার বাঁশির সুরে ব্রজবাসীর প্রাণ জেগে উঠবে? তমালছায়ায় কি আবার নূপুরের ধ্বনি বাজবে? হৃদয়-যমুনা কি আবার প্রেমের স্রোতে উজান বয়ে যাবে? আর অভাগিনী রাধার জীবনে কি সেই আনন্দময় দিন আর কোনোদিন ফিরে আসবে? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে উত্তর নেই; আছে শুধু দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও গভীর আকুলতা।
গানটির পরবর্তী অংশে উপস্থাপন করেছেন, কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে ব্রজের দৈনন্দিন স্থবির জীবনযাত্রার নিপূণ চিত্র থেমে গেছে। সেখানে রাখালেরা আর গোঠে যায় না; তারা পথের ধুলায় লুটিয়ে কাঁদে। গাভীরাও গোঠে থাকতে চায় না; তারা মথুরার দিকে ছুটে চলে, যেন তাদের প্রিয় রাখাল-রাজাকে খুঁজছে। এখানে পশুরাও কৃষ্ণবিরহে কাতর- এই কল্পনার মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, কৃষ্ণ কেবল মানুষের নয়, সমগ্র প্রাণিজগতের প্রাণকেন্দ্র।
এরপর প্রকৃতির রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। শুক-সারি পাখি উড়ে গেছে, কৃষ্ণকথার গান আর শোনা যায় না। শ্যামবর্ণ সহকার গাছের প্রাণ নেই, মাধবীলতা শুকিয়ে গেছে। কদম, তমাল, পল্লব—সবুজ প্রকৃতির সমস্ত হাসি, উৎসব ও সৌন্দর্য যেন লোপ পেয়েছে। এখানে প্রকৃতির এই বিবর্ণতা আসলে রাধা ও ব্রজবাসীর অন্তরের শূন্যতারই প্রতীক। কৃষ্ণবিহীন বৃন্দাবনে বসন্তও আর বসন্ত নয়।
গানটির শেষাংশে কবি আক্ষেপে বলেন, যেখানে একদিন চিরবসন্ত বিরাজ করত, আজ সেখানে কেবল শূন্যতা ও হাহাকার। ললিতা, বিশাখা, চন্দ্রাবলী, শ্রীদাম, সুদাম—কৃষ্ণলীলার সেই আপনজনদেরও আর দেখা যায় না। অর্থাৎ কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে যে প্রেম, বন্ধুত্ব ও আনন্দের সমাজ গড়ে উঠেছিল, তাঁর বিদায়ে সেই সমাজও ভেঙে পড়েছে। বৃন্দাবনের অস্তিত্ব যেন কৃষ্ণের সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্য ছিল।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। গানটি গীতি-শতদল সঙ্গীত সঙ্কলনের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৪১ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে (এপ্রিল ১৯৩৪)। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১১ মাস।
- গ্রন্থ:
- গীতি-শতদল।
- প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। কীর্তন]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল। কীর্তন। গান সংখ্যা ৭৭। পৃষ্ঠা ৩২৭]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০৩৬। পৃষ্ঠা: ৬১২]
- গীতি-শতদল।
- রেকর্ড: এইচএমভি [ জুন ১৯৩৪ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪১)]।এন ১৭৩৮৪। শিল্পী: শোভা গুপ্তা
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বিরহ
- সুরাঙ্গ: কীর্তনাঙ্গ