ব্রহ্মময়ী পরাৎ পরা ভব ভয় হরা (bromhomoyi porat pora bhobo)
ব্রহ্মময়ী পরাৎ পরা ভব ভয় হরা
অসি করা অকলঙ্ক শশী-শেখর॥
জগত-জন-জননী দনুজ-রিপু দলনী
(কভু) জীবের জীবন হর, (হর) শোক মৃত্যু জ্বরা॥
মহিষাসুর মর্দিনী ত্রিভুবন পালিনী
অশিব নাশিনী অয়ি শিব স্বয়ম্বরা॥
তব ধ্রুব পদ শিবের সাধনা...
সৃজন-প্রলয় পায়ে যুগল নূপুর পরা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে দেবী দুর্গা বা আদ্যাশক্তিকে সর্বশক্তিময়ী, বিশ্বজননী, অসুরনাশিনী এবং সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের অধিষ্ঠাত্রী পরাশক্তি হিসেবে বন্দনা করেছেন। দেবীর ভয়ংকর ও মঙ্গলময়—এই দুই রূপের এক অপূর্ব সমন্বয় এই গানের মূল বিষয়।
গানের শুরুতেই কবি দেবীকে 'ব্রহ্মময়ী”, 'পরাৎপরা' এবং 'ভবভয়হরা' বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ তিনি ব্রহ্মস্বরূপিণী, সকল পরৎপরা-রূপিণী শক্তি ও সত্তার ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী পরমেশ্বরী এবং সংসারের জন্ম-মৃত্যু, দুঃখ ও ভয়ের হাত থেকে জীবকে মুক্তিদানকারী। তাঁর হাতে অসি বা খড়্গ, যা অশুভ শক্তি ও অধর্ম বিনাশের প্রতীক। আবার তাঁর শিরে কলঙ্কহীন চাঁদ শোভা পাচ্ছে, যা তাঁর শান্ত, নির্মল ও মঙ্গলময় রূপের পরিচয় বহন করে। এরপর কবি তাঁকে জগতের সকল জীবের জননী বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি দানবদের বিনাশ করেন, আবার তিনিই সকল জীবের জীবনধারণের শক্তি দান করেন। সময় হলে তিনিই জীবন হরণ করেন এবং জন্ম, মৃত্যু, শোক ও জরা—এই সংসারচক্রের নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিরাজ করেন। অর্থাৎ সৃষ্টি ও লয়—উভয়ই তাঁর ইচ্ছাধীন।
গানটির পরবর্তী অংশে দেবীকে মহিষাসুরমর্দিনী এবং ত্রিভুবনের পালনকর্ত্রী হিসেবে বন্দনা করা হয়েছে। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশিনী, ধর্ম ও ন্যায়ের রক্ষক। একই সঙ্গে তিনি শিব-স্বয়ংবরা—অর্থাৎ স্বয়ং মহাদেবের অর্ধাঙ্গিনী। এই পরিচয়ের মাধ্যমে কবি শিব ও শক্তির অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। শিব শক্তিহীন হলে যেমন নিষ্ক্রিয়, তেমনি শক্তিও শিবের সঙ্গে যুক্ত হয়েই পূর্ণতা লাভ করেন।
গানটির শেষাংশে কবি বলেন, দেবীর চরণই শিবের ধ্যান ও সাধনার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর যুগল চরণে সৃষ্টি ও প্রলয় নূপুরের মতো শোভা পায়। অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বজগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও ধ্বংস—সবই তাঁর লীলার অংশ। তিনি সময়, প্রকৃতি ও মহাশক্তির চিরন্তন উৎস; তাঁর ইচ্ছাতেই বিশ্বচক্র আবর্তিত হয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম থেকে নজরুল পুরোপুরি নির্বাক ও স্থবির হয়ে গিয়েছিলেন।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২০৪৮। পৃষ্ঠা: ৬১৭]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। বন্দনা