ভারত শ্মশান হ’ল মা, তুই শ্মশানবাসিনী ব’লে (bharot shoshan holo maa)
ভারত শ্মশান হ’ল মা, তুই শ্মশানবাসিনী ব’লে।
জীবন্ত-শব নিত্য মোরা, চিতাগ্নিতে মরি জ্ব’লে॥
আজ হিমালয় হিমে ভরা,
দারিদ্র্য-শোক-ব্যাধি-জরা,
নাই যৌবন, যেদিন হতে শক্তিময়ী গেছিস্ চ’লে॥
(মা) ছিন্নমস্তা হয়েছিস্ তাই হানাহানি হয় ভারতে,
নিত্য-আনন্দিনী, কেন টানিস্ নিরানন্দ পথে?
শিব-সীমন্তিনী বেশে
খেল্ মা আবার হেসে হেসে,
ভারত মহাভারত হবে, আয় মা ফিরে মায়ের কোলে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি ভারতবর্ষের দুর্দশাকে শাক্ত ভাবধারার বিভিন্ন দেবীরূপের সঙ্গে যুক্ত করে মাতৃশক্তির কাছে তাঁর পুনরাগমনের আকুল আবেদন জানিয়েছেন। এখানে ‘মা’ কেবল দেশমাতৃকা নন; তিনি শ্যামা বা কালী—শক্তিরূপিণী জগন্মাতা, যাঁর বিভিন্ন রূপের মধ্য দিয়ে ভারতের সমকালীন অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পুনর্জাগরণের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে।
ভারত শ্মশান হ’ল মা, তুই শ্মশানবাসিনী ব’লে’—শ্মশানবাসিনী কালীকে সম্বোধন করে কবি বলেছেন, তাঁর শ্মশানবাসিনী রূপের সঙ্গে যেন ভারতও এক বিশাল শ্মশানে পরিণত হয়েছে। দেশবাসী বেঁচে থাকলেও তাদের জীবন পরাধীনতা, দুঃখ ও হতাশায় এমনভাবে বিপর্যস্ত যে তারা ‘জীবন্ত-শব’-এর মতো। প্রতিদিনের দুঃখ-দুর্দশা যেন তাদের চিতাগ্নির মতো দগ্ধ করে চলেছে।
এরপর কবি ভারতের সামগ্রিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। হিমালয় পর্যন্ত হিমে আচ্ছন্ন, আর সমগ্র দেশ দারিদ্র্য, শোক, ব্যাধি ও জরায় জর্জরিত। জাতির প্রাণে আর যৌবনের উদ্দীপনা নেই, নেই কর্মশক্তি ও প্রাণচাঞ্চল্য। শক্তিময়ী মা যেদিন থেকে অন্তরাল হয়েছেন, সেদিন থেকেই ভারত যেন তার শক্তি ও প্রাণ হারিয়েছে।
এরপর কবি মাতৃশক্তির আরেকটি ভয়ংকর রূপ ছিন্নমস্তা-কে স্মরণ করেছেন— ‘ছিন্নমস্তা হয়েছিস্ তাই হানাহানি হয় ভারতে।’ ছিন্নমস্তা দেবীর মুণ্ডচ্ছিন্ন, রক্তময় রূপ এখানে রক্তপাত, হিংসা ও আত্মবিনাশের প্রতীক। ভারতবর্ষে মানুষের পারস্পরিক হানাহানি ও রক্তপাত দেখে কবির মনে হয়েছে, আনন্দময়ী মাতৃশক্তি যেন ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছেন। তাই তাঁর আকুল প্রশ্ন— ‘নিত্য-আনন্দিনী, কেন টানিস্ নিরানন্দ পথে?’ অর্থাৎ যিনি মূলত আনন্দ ও জীবনের উৎস, তিনি কেন তাঁর সন্তানদের দুঃখ, বিভেদ ও ধ্বংসের পথে যেতে দিচ্ছেন?
শেষে কবি মাতৃশক্তির শুভ ও কল্যাণময় রূপের প্রত্যাবর্তন প্রার্থনা করেছেন। ‘শিব-সীমন্তিনী’ বলে তিনি তাঁকে শিবের সহধর্মিণী, অর্থাৎ শক্তিরূপিণী দেবী হিসেবে আহ্বান করেছেন। মা যেন তাঁর ভয়ংকর ধ্বংসরূপ ত্যাগ করে আবার হাসিমুখে, আনন্দ ও শক্তিরূপে ভারতে আবির্ভূত হন। তাঁর প্রত্যাবর্তনে মৃতপ্রায় ভারত আবার প্রাণ ফিরে পাবে, শক্তিশালী ও গৌরবময় হয়ে উঠবে এবং ‘ভারত’ পুনরায় ‘মহাভারত’-এ পরিণত হবে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৮) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৯৫১। পৃষ্ঠা: ২৮২]
- রেকর্ড: এইচএমভি [সেপ্টেম্বর ১৯৪১ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৮)। এন ২৭১৮৬। শিল্পী: জ্ঞান গোস্বামী]
- পত্রিকা:
- সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা [আশ্বিন ১৩৪৮ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪১)। আগমনী। মূলতান-একতালা। কথা: নজরুল ইসলাম। সুর নিতাই ঘটক। স্বরলিপি: কুমারী বিজলী ধর] [নমুনা]
- সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা [আশ্বিন ১৩৪৮ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪১)। আগমনী। মূলতান-একতালা। কথা: নজরুল ইসলাম। সুর নিতাই ঘটক। স্বরলিপি: কুমারী বিজলী ধর] [নমুনা]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- কুমারী বিজলী ধর। সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা [আশ্বিন ১৩৪৮ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪১) [নমুনা]
- নিতাই ঘটক। সঙ্গীতাঞ্জলি, প্রথম খণ্ড (জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৩৭৫। পৃষ্ঠা: ৭৬-৭৭] [নমুনা]
- পর্যায়