ভুবন-জয়ী তোরা কি হায়, সেই মুসলমান। (bhubon-joyi tora ki haay)

ভুবন-জয়ী তোরা কি হায়, সেই মুসলমান।
খোদার রাহে আনলো যারা দুনিয়া না-ফরমান।
এশিয়া য়ুরোপ আফ্রিকাতে যাহাদের তক্বীর
হুঙ্কাবিল, উড়ল যাদের বিজয়-নিশান॥
যাদের নাঙ্গা তলোয়ারের শক্তিতে সেদিন
পারস্য আর রোম রাজত্ব হইল খান-খান॥
শুকনো রুটি খোরমা খেয়ে যাদের খলিফা,
হেলায় শাসন করিল রে অর্ধেক জাহান॥
যাদের নবী কম্লিওয়ালা শাহানশাহ্ হয়ে,
আজকে তা’রা বিলাস-ভোগের খুলেছে দোকান॥
সিংহ-শাবক ভুলে আছিস্ শৃগালের দলে,
দুনিয়া আবার পায়ে কি তোর হবে কম্পমান॥

  • ভাবার্থ: মুসলিম জাগরণের জন্য রচিত উদ্দীপনামূলক এই গানে কবি মুসলিম জাতির অতীতের গৌরব, বর্তমানের অধঃপতন এবং পুনর্জাগরণের আহ্বানকে একসূত্রে গেঁথে উপস্থাপন করেছেন।

    গানের শুরুতে কবি, গভীর আক্ষপের সঙ্গে প্রশ্ন করেছেন- যারা একদিন আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করে সমগ্র পৃথিবীকে ন্যায়, সত্য ও ইসলামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিল, আজকের মুসলমানরা কি সেই একই জাতির উত্তরসূরি? একসময় এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাঁদের তাকবির (আল্লাহু আকবর ধ্বনি) প্রতিধ্বনিত হতো এবং তাঁদের বিজয়ের পতাকা উড্ডীন ছিল। তাঁদের ঈমান, সাহস ও আত্মত্যাগের কাছে শক্তিশালী পারস্য ও রোম সাম্রাজ্য পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল।

    প্রসঙ্গক্রমে কবি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সে যুগের মুসলিম শাসকদের শক্তির উৎস ছিল না বিলাসিতা বা ধনসম্পদ; বরং ছিল সংযম, ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস। খলিফারা সাধারণ মানুষের মতো শুকনো রুটি ও খেজুর খেয়েও বিশ্বের বিরাট অংশ শাসন করতেন। তাঁদের চরিত্রের মহত্ত্বই ছিল প্রকৃত ক্ষমতার ভিত্তি।

    এরপর কবি বর্তমান মুসলিম সমাজের চিত্র তুলে ধরে বলেছেন- যে জাতির নবী ছিলেন অত্যন্ত সরল জীবনযাপনের অধিকারী ছিলেন, যিনি মোটা উলের কম্বল (কম্লি) পরিধান করতেন এবং দুনিয়াবিমুখ জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়েছিলেন- সেই জাতিই আজ ভোগ-বিলাস, আরাম-আয়েশ ও পার্থিব মোহে নিমগ্ন। তারা নবীর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে আত্মমর্যাদা ও শক্তি হারিয়েছে।

    সবশেষে কবি মুসলমানদের উদ্দেশে জাগরণের হারানো ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন-  'তোমরা তো সিংহের শাবক, অথচ আজ শৃগালের দলে মিশে নিজের শক্তি ও পরিচয় ভুলে বসে আছ। যদি তোমরা আবার ঈমান, সাহস, আত্মত্যাগ এবং নৈতিক আদর্শে বলীয়ান হও, তবে পৃথিবী আবার তোমাদের শক্তি ও মর্যাদাকে স্বীকার করবে এবং তোমাদের পদধ্বনিতে বিশ্ব পুনরায় কম্পিত হবে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ' গুলবাগিচা' গীতি-সংকলনের প্রথম সংস্করণে [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩]  গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • গুলবাগিচা
      • প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। পাহাড়ী মিশ্র-কার্ফা। পৃষ্ঠা: ১০১]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১।  গুল-বাগিচা। গান সংখ্যা ৮২। পাহাড়ী মিশ্র-কার্ফা। পৃষ্ঠা ২৭৫-২৭৬]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৬৫১। রাগ: পাহাড়ি মিশ্র, তাল: কাহার্‌বা। পৃষ্ঠা: ৪৯৩।]
  • রেকর্ড: মেগাফোন [জুলাই ১৯৩৪ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪১)]। জেএনজি ১২৪। শিল্পী: শেখ মোহন।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াংশ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। জাগরণ

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।