মদির আঁখির সুধায় সাকি (modir akhir sudhay saki)
মদির আঁখির সুধায় সাকি ডুবাও আমার এ তনু মন
আজিকে তোমায় ও আমায় বেদনার বাসর জাগরণ।
মদালস ও আঁখি তব, সাকি, দিল দোলা প্রাণে॥
বাদল-ছাওয়া এ গুল্-বাগিচায় বুলবুল কাঁদে গজল গানে॥
গোলাবী গুলের নেশা ছিল মোর ফুলেল্ ফাগুনে।
শুকায়ে গিয়াছে ফুলবন, নাই গোলাব গুলিস্তানে॥
শুনি, সাকি তোমার কাছে ব্যথা-ভোলার দারু আছে—
হিয়া কোন্ অমিয়া যাচে জান তুমি, খোদা জানে॥
দুখের পশরা লয়ে বিফল কাঁদিয়া বৃথা (সাকি)।
সকলি গিয়াছে যখন যাক ঈমান শারাব পানে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি গভীর মানসিক বেদনা ও আধ্যাত্মিক শূন্যতার মধ্যে এক ধর্মগুরুর সান্নিধ্যে মুক্তি খোঁজার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। এখানে ‘সাকি’ কোনো পার্থিব মদ পরিবেশনকারী নয়; বরং তিনি এক পথপ্রদর্শক ধর্মগুরু, আর ‘শরাব’ বা ‘মদ’ হলো সেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান বা ধর্মদর্শন, যা মানবমনের দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘব করতে পারে।
কবি ধর্মগুরুর করুণাময় দৃষ্টি ও জ্ঞানের সুধায় নিজের দেহ-মনকে নিমজ্জিত করতে চান। তাঁর বর্তমান জীবন যেন বেদনার এক জাগ্রত বাসর, যেখানে আনন্দের পরিবর্তে দুঃখই প্রধান সঙ্গী। ধর্মগুরুর মমতাময় দৃষ্টি তাঁর অন্তরে আলোড়ন তোলে এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের ইঙ্গিত দেয়।
প্রকৃতির চিত্র—বাদল-ছাওয়া বাগিচা, বুলবুলের করুণ গজল—সবই কবির অন্তরের বিষাদের প্রতীক। একসময় তাঁর জীবন ছিল ফুলেল, আনন্দময়; কিন্তু এখন সেই ‘গুলিস্তান’ শুকিয়ে গেছে, অর্থাৎ তাঁর জীবনে আধ্যাত্মিক শান্তি ও সৌন্দর্য বিলুপ্ত হয়েছে।
কবি বিশ্বাস করেন, ধর্মগুরুর কাছে এমন এক আধ্যাত্মিক ‘দারু’ (ধর্মদর্শন) আছে, যা মানুষের হৃদয়ের গভীর বেদনা দূর করতে পারে। তাই তিনি সেই জ্ঞান ও সত্যের অমৃত লাভের জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। তাঁর এই অন্তর্লীন আকাঙ্ক্ষা এতই গভীর যে, তা কেবল তাঁর অন্তর ও স্রষ্টাই জানেন।
শেষাংশে কবি চরম হতাশা থেকে বলেন—যখন দুঃখের ভারে তাঁর সবকিছু ভেঙে পড়েছে, তখন তিনি সেই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আশ্রয় নিতে চান, যাতে তাঁর দুঃখ দূর হয় এবং জীবনে নতুন অর্থ ফিরে আসে। এখানে ‘ঈমান শারাব পানে যাওয়া’ আসলে ধর্মগুরুর প্রদত্ত আধ্যাত্মিক সত্যে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত 'সুর-সাকী' গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ:
- সুর-সাকী
- প্রথম সংস্করণ [আষাঢ় ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ। জুলাই ১৯৩২] সুর-সাকী ২৫
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮, মে ২০১১। ২৫। পিলু-মিশ্র। পৃষ্ঠা: ২৩৬-২৩৭]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। গান সংখ্যা ৪৬৬]
- সুর-সাকী
- রেকর্ড: হিন্দুস্থান [সেপ্টেম্বর ১৯৩২ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৩৯)]। এইচ. ৭। শিল্পী: উমাপদ ভট্টাচার্য। [শ্রবণ নমুনা] [জয়িতা অর্পা (শ্রবণ নমুনা)]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- নিতাই ঘটক। সঙ্গীতাঞ্জলি, প্রথম খণ্ড (জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৩৭৫। পৃষ্ঠা: ১৭-২০] [নমুনা]
- রশিদুন্ নবী [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, ষোড়শ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট আশ্বিন ১৪০৪/অক্টোবর ১৯৯৩। ১৪ সংখ্যক গান। রেকর্ডে উমাপদ ভট্টাচার-এর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে] [নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
- পর্যায়: