মনে যে মোর মনের ঠাকুর (mone je mor moner thakur)

         মনে যে মোর মনের ঠাকুর তারেই আমি পূজা করি,
         আমার দেহের পঞ্চভূতের পঞ্চপ্রদীপ তুলে ধরি॥
                    ফকির যোগী হয়ে বনে
                    ফিরি না তার অন্বেষণে
আমি    মনের দুয়ার খুলে দেখি রূপের জোয়ার মরি মরি॥
                    আছেন যিনি ঘিরে আমায়
                    তারে আমি খুঁজব কোথায়
          সাগরে খুঁজে বেড়াই সাগর বুকে ভাসিয়ে তরী।
                    মন্দিরের ঐ বন্ধ খোঁপে
                    ঠাকুর কি রয় পূজার লোভে?
         পেতে রাখি ভক্তি বেদী আসবে নেমে প্রেমের হরি॥

  • ভাবসন্ধান: পরমসত্তা সর্বত্র বিরাজমান। তিনিই পরমাত্মা রূপে মানুষের অন্তরে বিরাজ করেন। তাঁকে পাওয়ার জন্য বাহ্যিক আচার, বনবাস বা কঠিন সাধনার চেয়ে বেশি প্রয়োজন নির্মল মন, গভীর ভক্তি ও নিঃস্বার্থ প্রেম। হৃদয়কে ভক্তির আসন করে তুলতে পারলেই সেখানে প্রেমময় তাঁর উপলব্ধি ঘটে। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে তিনি তুলে ধরেছেন মানুষের আরাধ্য পর্মসত্তার স্বরূপ। তিনি মনে করেন- তাঁকে বাইরে কোথাও খোঁজার প্রয়োজন নেই, কারণ তিনি মানুষের নিজের মনের মধ্যেই আছেন। তাই কবি নিজের অন্তরের সেই “মনের ঠাকুর”-কেই পূজা করেন।

    মানুষের দেহ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম—এই পাঁচটি উপাদানে গঠিত। কবি নিজের সমগ্র দেহ ও জীবনকেই পরমাত্মার পূজার প্রদীপ হিসেবে উৎসর্গ করতে চান। তাঁকে খোঁজার জন্য ফকির বা যোগী হয়ে বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই। নিজের মনকে নির্মল করে তার দরজা খুললেই অন্তরে তাঁর অপরূপ রূপ অনুভব করা যায়। তাই কবি বলেন- যিনি সর্বক্ষণ তাঁকে ঘিরে আছেন, যিনি আমার অন্তরেই রয়েছেন, তাঁকে আবার বাইরে কোথায় খোঁজার দরকার কি। একটি চমৎকার উপমা অবলম্বনে বলেছেন-  সমুদ্রের মধ্যে থেকেই কেউ যদি সমুদ্রকে খুঁজে বেড়ায় তা যেমন হর্থহীন,  তেমনি পর্মাত্মায় নিমজ্জিত থেকে তাঁকে বাইরে খোঁজাও অর্থহীন। তিনি এই ভাবনার সম্প্রসারিত রূপে বলেছেন- তিনি কেবল মন্দিরের চার দেয়াল বা বাহ্যিক পূজার মধ্যে আবদ্ধ নন। শুধু আচার-অনুষ্ঠান বা পূজার সামগ্রী দিয়ে তাঁকে পাওয়া যায় না। তাই কবি হৃদয়ের মধ্যে ভক্তির বেদী তৈরি করে রাখেন। তিনি মনে করেন সত্যিকারের প্রেম ও ভক্তিতে পূর্ণ হবে, তখন সেই হৃদয়েই “প্রেমের হরি” প্রকাশিত হবেন।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ' গুলবাগিচা ' গীতি-সংকলনের প্রথম সংস্করণে [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩]  গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • গুলবাগিচা। প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। কানাড়া মিশ্র-রূপক। গুল-বাগিচা-৬২।
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৪৯৬ সংখ্যক গান। 
  • রেকর্ড
    • এইচএমভি [জুলাই ১৯৩৫ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪১)। শিল্পী: তারক প্রসাদ পাঠক। রেকর্ডটি পরে বাতিল হয়ে যায়]
    • এইচএমভি। মার্চ ১৯৩৮  (ফাল্গুন- চৈত্র ১৩৪৪)। এন ১৭০৫৪। শিল্পী: কে মল্লিক  [শ্রবণ নমুনা]
       
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সেলিনা হোসেন [একবিংশ খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা] ১৯ সংখ্যক গান। [নমুনা]
  • সুরকার: ধীরেন দাশ
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। পরমসত্তা
      • সুরাঙ্গ: স্বকীয়
      • তাল: দাদরা
      • গ্রহস্বর: ন্

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।