মম জনম মরণের সাথী

মম জনম মরণের সাথী।
তোমারে না ভুলি যেন দিন রাতি॥
তোমারে না হেরি আঁধার ত্রিভুবন
নিভে যায় নয়নের বাতি,
বাতায়ন খুলিয়া চাহি পথ পানে
কাঁদি কুসুম-সেজ পাতি॥
তোমারি আশায় তেয়াগিনু সব সুখ
আর মোরে রাখিও না দূরে,
তুমি যেন ছেড় না মোরে ঘনশ্যাম
মোরে বাঁধো তব চরণ নূপুরে।
মীরার প্রভু তুমি পরম মনোহর
তব প্রেম-রসে রহি মাতি’
পলক না পড়ে হরি হরি যেন নিশিদিন
অপরূপ তব মুখ-পাতি॥

  •  ভাবসন্ধান: কৃষ্ণই ভক্তের চিরন্তন সঙ্গী। তাঁর স্মরণ ও দর্শন ছাড়া ভক্তের কাছে পৃথিবী অন্ধকারময়। জাগতিক সুখ-সম্পদ ত্যাগ করে ভক্ত তাঁর চরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে চান এবং তাঁর প্রেমে সর্বক্ষণ নিমগ্ন থাকতে চান। এই ভাবদর্শে রচিত এই গানে কৃষ্ণের প্রতি একনিষ্ঠ প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং বিরহের আকুলতা উপস্থাপিত হয়েছে।

    ভক্তের কাছে ভগবানই জন্ম-মৃত্যুর একমাত্র চিরসঙ্গী; তাই তাঁর স্মরণ ও দর্শন ছাড়া ভক্তের জীবন অর্থহীন। জীবনের সব সম্পর্ক পরিবর্তনশীল, কিন্কৃষ্ণই চিরন্তন সঙ্গী। তাঁর দর্শন না পেলে সমগ্র পৃথিবী ভক্তের কাছে অন্ধকার হয়ে যায়; চোখের আলোও যেন নিভে যায়। প্রিয়তমের আগমনের আশায় ভক্ত জানালা খুলে পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং তাঁর জন্য ফুলের শয্যা সাজিয়ে অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে অপেক্ষা করেন।

    ভক্তের প্রত্যাশা প্রভু যেন তাঁকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে না দেন। তাই ঘনশ্যাম-এর চরণে নিজেকে এমনভাবে বেঁধে দিতে চান, যাতে কোনোদিন তাঁর সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না হয়। এখানে চরণ-নূপুরে বাঁধা পড়া আসলে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক।

    গানের শেষাংশে ভক্ত তাঁর আরাধ্য মীরার প্রভু কৃষ্ণকে পরম মনোহর বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁর প্রেমের অমৃতরসে ভক্ত সর্বদা মগ্ন থাকতে চান। চোখের পলকও যেন না পড়ে—অর্থাৎ এক মুহূর্তের জন্যও যেন কৃষ্ণের অপরূপ মুখের দর্শন ও স্মরণ থেকে মন বিচ্যুত না হয়। “হরি হরি” নামের অবিরাম জপের মধ্য দিয়ে সেই প্রেম আরও গভীর হয়ে ওঠে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ২০৬০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬২০।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। শ্রীকৃষ্ণ। আত্মনিবেদন।

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।