অগ্নি-গিরি ঘুমন্ত উঠিল জাগিয়া [ogni- giri ghumonto uthilo jagiya]
অগ্নি-গিরি ঘুমন্ত উঠিল জাগিয়া।
বহ্নি-রাগে দিগন্ত গেল রে রাঙিয়া॥
রুদ্র রোষে কি শঙ্কর ঊর্ধ্বের পানে
লক্ষ-ফণা ভুজঙ্গ-বিদ্যুৎ হানে
দীপ্ত তেজে অনন্ত-নাগের ঘুম ভাঙিয়া॥
লঙ্কা-দাহন হোমাগ্নি সাগ্নিক মন্ত্র
যজ্ঞ-ধূম বেদ-ওঙ্কার ছাইল অনন্ত।
খড়গ-পাণি শ্রীচণ্ডী অরাজক মহীতে
দৈত্য নিশুম্ভ-শুম্ভে এলো বুঝি দহিতে,
বিশ্ব কাঁদে প্রেম-ভিক্ষু আনন্দ মাগিয়া॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটি তিনি রচনা করেছিলেন- জগৎঘটক রচিত জীবনস্রোত' গীতি-আলেখ্যের জন্য। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারি বেতার জগত পত্রিকায় জীবনস্রোত' গীতি-আলেখ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল-
'জীবনস্রোতে গানের ভিতর দিয়ে যে দার্শনিকতার সূচনা করা হয়েছে তা রসিক মনকে স্পর্শ করবে বলে আমার ধারণা’। সম্ভবত কবি এমনি একটি জীবনদর্শনকে উপস্থাপন করেছেন- 'বিশ্ব কাঁদে প্রেম-ভিক্ষু আনন্দ মাগিয়া' পংক্তিতে। হয়তো কবি শান্তিবিঘ্নকারী সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছেন প্রবহমান জীবনস্রোতের আনন্দ-বেদনা। জগতসংসারের সুপ্ত হিংসা-বিদ্বেষ কখনো কখনো অনিবার্যভাবে জেগে উঠে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো। জগত-সংসার যখন হিংসা-বিদ্বেষের তীব্রদহনে উৎপীড়িত হয়, তখন আনন্দের প্রত্যশায় বিশ্বজগৎ প্রেম-ভিক্ষু হয়ে বিলাপ করে।'
উল্লেখ্য, জীবনস্রোত কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারিতে। জীবনস্রোতের ৭টি গানই প্রকৃতি-কেন্দ্রিক। এর ভিতরে এই গানটিতেই পাওয়া যায়, প্রকৃতির ভিতর দিয়ে জীবনস্রোতের মূল দর্শন। এই বিচারে এই গানটিকে বলা যায়- এই গীতি-আলেখ্যের ভূমিকা।
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল, কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়- সারং অঙ্গ-ভিত্তিক গীতি-আলেখ্য সারঙ্গ রঙ্গ। উক্ত এই গীতিআলেখ্যে এই গানটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন। ভারতবর্ষ পত্রিকার (বৈশাখ ১৩৪৭ (এপ্রিল- মে ১৯৪০) সংখ্যায় তা প্রকাশিত হয়েছিল জগৎঘট-কৃত স্বরলিপি-সহ। স্বরলিপির শেষ লঙ্কাদাহন সারং রাগের সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও দিয়েছিলেন।
এই গানটি তিনি বেঁধেছিলেন- অপ্রচলিত লঙ্কাদহন-সারং রাগে। অপ্রচলিত লুপ্তপ্রায় রাগকে প্রচলিত করার বাসনা থেকে হয়তো তিনি গানটি বেঁধেছিলেন লঙ্কাদাহন সারং রাগে। তাঁর এই ভাবনার বিষয়টি সম্পর্কে জানা যায় মনোরঞ্জন সেনের 'সঙ্গীত স্রষ্টা নজরুল' প্রবন্ধে। তাঁর মতে-
'নজরুল ইসলাম রাগ-রাগিণীর এই বৃহৎ ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন বিভিন্নভাবে। গ্রামোফোন কোম্পানীতে তিনি ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খানের সান্নিধ্যে আসেন এবং কার্যত তাঁর শিষ্বত্ব গ্রহণ করেন। মুর্শিদাবাদ-নিবাসী ওস্তাদ কাদের বক্স ও মঞ্জু সাহেবের নিকটও তিনি বহু রাগ-রাগিণী আয়ত্ত করেন। ঠাকুর নবাব আলী চৌধুরী প্রণীত সঙ্গীত-পুস্তক থেকে তিনি বহু অপ্রচলিত ও লুপ্তপ্রায় রাগ-রাগিণীর হদিস পান। উদাহরণ হিসেবে লঙ্কাদহন-সারং রাগটি ধরা যায়। এই রাগে তিনি এই গানটি রচনা করেছিলেন' [সূত্র: মনোরঞ্জন সেন, সঙ্গীত স্রষ্টা নজরুল, সুধীজনের দৃষ্টিতে নজরুল সঙ্গীত, পৃষ্ঠা-১৫৬]
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারি বেতার জগত পত্রিকায় এই গীতি-আলেখ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল-
'জীবনস্রোতে গানের ভিতর দিয়ে যে দার্শনিকতার সূচনা করা হয়েছে তা রসিক মনকে স্পর্শ করবে বলে আমার ধারণা'। সম্ভবত কবি এমনি একটি জীবনদর্শনকে উপস্থাপন করেছেন- 'বিশ্ব কাঁদে প্রেম-ভিক্ষু আনন্দ মাগিয়া' পংক্তিতে। হয়তো কবি শান্তিবিঘ্নকারী সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মধ্য খুঁজে পেতে চেয়েছেন প্রবহমান জীবনস্রোতের আনন্দ-বেদনা। জগতসংসারের সুপ্ত হিংসা-বিদ্বেষ কখনো কখনো অনিবার্যভাবে জেগে উঠে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো। জগত-সংসার যখন হিংসা-বিদ্বেষের তীব্রদহনে উৎপীড়িত হয়,তখন আনন্দের প্রত্যশায় বিশ্বজগৎ প্রেম-ভিক্ষু হয়ে বিলাপ করে।
শান্তিবিঘ্নকারী দানবীয় শক্তির অশুভ উত্থানে, জগতে যে অকল্যাণের সূচনা হয়, তারই বিবরণ সনাতন ধর্মের পৌরাণিক চরিত্রে রূপকতায় উপস্থাপন করা হয়েছে এই গানে। এ গানের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হলো- জীবনস্রোতের শান্তিবিঘ্নকারী দানবীয় শক্তি। জীবনস্রোতের সমান্তরাল অনুভবকে প্রচ্ছন্ন রেখে, ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি সক্রিয় হওয়ার বিবরণ দেওয়া হয়েছে এই গানে। কবি এই ঘুমন্ত ভয়ঙ্কর শক্তিকে উপস্থাপন করেছেন- পাতালের অনন্ত নাগের লক্ষ-ফণা যুক্ত সর্প-বিদ্যুতের রূপকতায়। যেন এই অশুভ শক্তি জগৎজুড়ে অনন্ত নাগরূপে মহাদেবের তীব্র ক্রোধ হয়ে জেগে উঠেছে। তার তীব্র তেজরূপী লক্ষ ফণায় হিংসা-বিদ্বেষের তীব্র বিষবাষ্পে জগৎ সংসার হয়ে উঠেছে বিষময়।
গানটির সঞ্চারী ও আভোগে শান্তিবিঘ্নকারী দানবীয় শক্তির তীব্রতাকে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছেন- নানা ধরনের পৌরাণিক রূপকল্পে। যেমন রাম-রাবণের যুদ্ধে রাবণের রাজধানী লঙ্কার সাগ্নিক মন্ত্রে দহন, ধ্বংসযজ্ঞের উচ্চারিত বেদমন্ত্রের তেজ, যজ্ঞের ধোঁয়া, শুম্ভ-নিশুম্ভ নামক দুই দৈত্যের হত্যাকারিণী ভয়ঙ্করী শ্রীচণ্ডীর তেজদীপ্ত রূপ- এ সবই শান্তিবিঘ্নকারী দানবীয় শক্তিকে নির্দেশিত করে। এই দানবীয় শক্তির অত্যাচার থেকে মুক্তি লাভের আনন্দ-প্রত্যাশায় প্রেম-ভিক্ষু হয়ে ক্রন্দসী হয়ে ওঠে জগৎবাসী।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু যায় নি। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি (বৃ্হস্পতিবার ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২), জগৎঘটকের রচিত জীবনস্রোত (গীতি-আলেখ্য, কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। এই নাটকে এ গানটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৭ মাস।
উল্লেখ্য, মনোরঞ্জন সেনের 'সঙ্গীত স্রষ্টা নজরুল' প্রবন্ধ থেকে জানা যায় যে, নজরুল ইসলাম রাগ-রাগিণীর এই বৃহৎ ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিলেন বিভিন্নভাবে। গ্রামোফোন কোম্পানীতে তিনি ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খানের সান্নিধ্যে আসেন এবং কার্যত তাঁর শিষ্বত্ব গ্রহণ করেন। মুর্শিদাবাদ-নিবাসী ওস্তাদ কাদের বক্স ও মঞ্জু সাহেবের নিকটও তিনি বহু রাগ-রাগিণী আয়ত্ত করেন। ঠাকুর নবাব আলী চৌধুরী প্রণীত সঙ্গীত-পুস্তক থেকে তিনি বহু অপ্রচলিত ও লুপ্তপ্রায় রাগ-রাগিণীর হদিস পান। উদাহরণ হিসেবে লঙ্কাদহন-সারং রাগটি ধরা যায়। এই রাগে তিনি এই গানটি রচনা করেছিলেন। [সূত্র: মনোরঞ্জন সেন, সঙ্গীত স্রষ্টা নজরুল, সুধীজনের দৃষ্টিতে নজরুল সঙ্গীত, পৃষ্ঠা-১৫৬]
- পত্রিকা: ভারতবর্ষ। বৈশাখ ১৩৪৭ (এপ্রিল- মে ১৯৪০)। স্বরলিপিকার-জগৎ ঘটক। সুর-নজরুল ইসলাম। রাগ: লঙ্ক-দহন সারং। তেতালা [নমুনা]
- বেতার:
- জীবনস্রোত [গীতি-আলেখ্য। রচনা জগৎঘটক। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬। ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২। সান্ধ্য অনুষ্ঠান: ৮.৩০-৯.১৪ মিনিট
[সূত্র:- বেতার জগৎ। সপ্তম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা। ১৬ ফেব্রুয়ারি. ১৯৩৬ [পৃষ্ঠা ১৭২]
- The Inidian Listener পত্রিকার ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ সংখ্যা। পৃষ্ঠা ২৩২]
- সারঙ্গ রঙ্গ (গীতি আলেখ্য. সারঙ্গ অঙ্গের রাগভিত্তিক অনুষ্ঠান)
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ৬ এপ্রিল ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (শনিবার ২৪ চৈত্র ১৩৪৬), সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৭.১৫-৭.৫০ মিনিট। শিল্পী: শৈল দেবী [পাণ্ডুলিপি]
[সূত্র: বেতার জগৎ-এর ১১শ বর্ষ, ৭ম সংখ্যা অনুষ্ঠান সূচী। পৃষ্ঠা: ৩৪০, ৩৬৯] - দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৩ নভেম্বর ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (শনিবার ৭ অগ্রহায়ণ ১৩৪৭)। তৃতীয় অধিবেশন। ৮.০০-৮.৩৯।
[সূত্র: বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ২২ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ১২৮৬
- রেকর্ড সূত্র: [শ্রবণ নমুনা] (ঐশ্বর্য সমাদ্দার) {রেকর্ড সূত্র: আধো ধরণী আলো আধো আঁধার, নজরুল সংগীত সংকলন ২য় খন্ড}
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ৬ এপ্রিল ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (শনিবার ২৪ চৈত্র ১৩৪৬), সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৭.১৫-৭.৫০ মিনিট। শিল্পী: শৈল দেবী [পাণ্ডুলিপি]
- জীবনস্রোত [গীতি-আলেখ্য। রচনা জগৎঘটক। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬। ১৪ ফাল্গুন ১৩৪২। সান্ধ্য অনুষ্ঠান: ৮.৩০-৯.১৪ মিনিট
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: জগৎ ঘটক। ভারতবর্ষ। বৈশাখ ১৩৪৭। এপ্রিল- মে ১৯৪০ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: জাগতিক, ঋতুনিরপেক্ষ। প্রকৃতি ও জীবন-দর্শন
- সুরাঙ্গ: খেয়ালাঙ্গ
- রাগ: লঙ্কাদাহন সারং
- তাল: ত্রিতাল
- গ্রহস্বর: সা