মা! আমি তোর অন্ধ ছেলে হাত ধ'রে

মা! আমি তোর অন্ধ ছেলে হাত ধ'রে মোর নিয়ে যা মা।
পথ নাহি পাই যেদিকে চাই দেখি আঁধার ঘোর ত্রিযামা॥
আমি নিজে পথ চলিতে যাই
বারে বারে পথ ভুলি মা তাই
মায়া-কূপে পড়ে কাঁদি কোথায় দয়াময়ী শ্যামা॥
মা তুই যবে হাত ধ'রে চলিস্‌ রয় না পতন-ভয়,
তুই যবে পথ দেখাস্‌ মা গো সে পথ জ্যোতির্ময়।
কি হবে জ্ঞান-প্রদীপ নিয়ে সাথে
বৃথা এ দীপ জন্মান্ধের হাতে
তুই যদি হ'স নির্ভর মোর পথের ভয় আর রবে না মা॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে একজন অসহায় ভক্ত নিজেকে জন্মান্ধ পথিকেরূপে কল্পনা করে দেবী শ্যামার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন। এখানে অন্ধত্ব কেবল শারীরিক অন্ধত্ব নয়; এটি মানুষের আধ্যাত্মিক অজ্ঞানতা, জীবনের সত্য পথ চিনতে না পারা এবং মায়ার মোহে আবদ্ধ থাকার প্রতীক। ভক্ত অনুভব করেন যে, নিজের জ্ঞান ও শক্তির উপর নির্ভর করে তিনি জীবনের প্রকৃত পথ খুঁজে পান না; তাই মাতৃশক্তির করুণাই তাঁর একমাত্র আশ্রয়।

    'মা! আমি তোর অন্ধ ছেলে হাত ধ’রে মোর নিয়ে যা মা' -এই আকুতির মধ্যে সন্তানসুলভ নির্ভরতা ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ প্রকাশ পেয়েছে। সন্তান যেমন বিপদে মায়ের হাত ধরে নিরাপদে চলতে চায়, তেমনি ভক্তও সংসার ও জীবনের দুরূহ পথে দেবীমাতার হাত ধরে চলার প্রার্থনা জানিয়েছেন। চারদিকে তাঁর কাছে “আঁধার ঘোর ত্রিযামা”—অর্থাৎ অজ্ঞানতা, সংশয়, মোহ ও অনিশ্চয়তার গভীর অন্ধকার। তিনি জানেন না কোন পথে গেলে মুক্তি ও কল্যাণ লাভ হবে।

    মানুষ যখন অহংকার করে নিজের বুদ্ধি ও শক্তির দ্বারা জীবন পরিচালনা করতে চায়, তখন সে প্রায়ই ভুল পথে পরিচালিত হয়। সংসারের মায়া-কূপে পতিত হয়ে সে দুঃখ ও বিভ্রান্তিতে কাঁদে। এখানে মায়া-কূপ হলো জাগতিক কামনা, লোভ, মোহ ও আসক্তির প্রতীক। সেই গভীর বিপদে পড়ে ভক্ত তখন দয়াময়ী শ্যামাকে স্মরণ করেন। দেবীমাতা যখন ভক্তের পথপ্রদর্শক হন, তখন জীবনের সমস্ত ভয় দূর হয়ে যায়। তাঁর দেখানো পথ জ্যোতির্ময়- অর্থাৎ জ্ঞান, সত্য, শান্তি ও মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত। মানুষের জীবনে প্রকৃত নিরাপত্তা কেবল বাহ্যিক শক্তিতে নয়, পরমাশ্রয়ের অনুভূতিতে নিহিত।

    সবশেষে কবি অত্যন্ত গভীর একটি দার্শনিক কথা বলেছেন- 'কি হবে জ্ঞান-প্রদীপ নিয়ে সাথে, বৃথা এ দীপ জন্মান্ধের হাতে।' এখানে জ্ঞান-প্রদীপ মানুষের অর্জিত বিদ্যা, বুদ্ধি ও শাস্ত্রজ্ঞানকে বোঝায়। কিন্তু অন্তরের সত্যদৃষ্টি না থাকলে কেবল বাহ্যিক জ্ঞান মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে না। জন্মান্ধের হাতে প্রদীপ থাকলেও সে যেমন আলো দেখতে পায় না, তেমনি দেবীর কৃপাহীন ও আত্মজ্ঞানহীন মানুষের কাছে কেবল পাণ্ডিত্য যথেষ্ট নয়। প্রকৃত জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন দেবীর করুণায় মানুষের অন্তরচক্ষু উন্মীলিত হয়।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৫) টুইন  মাসে, রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ২ মাস।
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ২০৬১ সংখ্যক গান। রাগ: মিশ্র হাম্বির, তাল: দাদরা। পৃষ্ঠা: ৬২১।
  • রেকর্ড: টুইন [আগষ্ট ১৯৩৮ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৫)। এফটি ১২৪৮৮। শিল্পী: নারায়ণ দাসগুপ্ত]
     
  • সুরকার: সুবল দাশগুপ্ত
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ:  ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। আত্মনিবেদন
    • সুরাঙ্গ: রাগাশ্রয়ী
    • রাগ: হাম্বীর
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: মর

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।