মা কবে তোরে পারব দিতে (maa kobe tore parbo dite)

মা   কবে তোরে পারব দিতে আমার সকল ভার।
      ভাবতে কখন পারব মাগো নাই কিছু আমার॥
              কারেও আনিনি মা সঙ্গে ক’রে
              রাখতে নারি কারেও ধ’রে
      তুই দিস, তুই নিস্ মা হ’রে (আমার) কোথায় অধিকার॥
      হাসি খেলি, চলি, ফিরি ইঙ্গিতে মা তোরই,
      তোরই মাঝে লভি, তোরই মাঝে মরি।
              পুত্র-মিত্র-কন্যা-জায়া,
              মহামায়া তোরই মায়া,
      মা তোর লীলার পুতুল আমি ভাবতে দে এবার॥

  • ভাবসন্ধান: সংসারের সব দায়িত্ব, অহংকার ও ‘আমার’ বলে অধিকার করার মানসিকতা ত্যাগ করে মহামায়ার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। ভক্ত উপলব্ধি করতে চান যে, জীবনের সবকিছুই মায়ের দান, তাঁরই ইচ্ছায় লাভ ও ক্ষতি ঘটে এবং সকল সম্পর্ক তাঁরই লীলার অংশ। এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই ভক্ত প্রকৃত শান্তি ও মুক্তি লাভ করতে চান। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে মহামায়ার কাছে ভক্তের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, সংসার-আসক্তি থেকে মুক্তি এবং ‘আমার’ বলে কিছু নেই—এই গভীর সত্য উপলব্ধির আকুল প্রার্থনা উপস্থাপিত হয়েছে।

    গানের শুরুতে ভক্ত মায়ের কাছে জানতে চেয়েছেন—কবে তিনি জীবনের সমস্ত ভার মায়ের হাতে সমর্পণ করতে পারবেন? মানুষ সাধারণত সংসার, সম্পদ, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত থাকে এবং সবকিছুকে নিজের বলে মনে করে। কিন্তু ভক্ত সেই ‘আমিত্ব’ ও ‘আমারত্ব’ থেকে মুক্ত হতে চান। তিনি এমন উপলব্ধি লাভ করতে চান, যাতে সত্যিই বলতে পারেন—“নাই কিছু আমার।”

    গানের পরের অংশে জীবনের চিরন্তন সত্যটি প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ পৃথিবীতে জন্মের সময় কাউকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে না, আবার কাউকেই চিরদিন নিজের কাছে ধরে রাখতে পারে না। পুত্র, বন্ধু, কন্যা, স্ত্রী কিংবা অন্য কোনো আপনজন—কেউই মানুষের চিরস্থায়ী সম্পত্তি নয়। তাই ভক্ত উপলব্ধি করেন— তুই দিস, তুই নিস্ মা—আমার কোথায় অধিকার? অর্থাৎ জীবনে যা কিছু পাওয়া যায়, তা মায়ের দান; আবার যা হারিয়ে যায়, তাও তাঁরই বিধান। মানুষের নিজের বলে দাবি করার প্রকৃত কোনো অধিকার নেই।

    পরবর্তী পঙ্ক্তিতে বলা হয়েছে, মানুষের হাসি, খেলা, চলাফেরা ও জীবনযাত্রা সবই মায়ের ইঙ্গিতে পরিচালিত। ভক্ত তাঁর মধ্যেই জীবনকে লাভ করেন এবং তাঁর মধ্যেই মৃত্যুর মাধ্যমে বিলীন হন। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের সমস্ত অস্তিত্ব সেই পরম মাতৃশক্তির মধ্যেই অবস্থিত।  

    “পুত্র-মিত্র-কন্যা-জায়া, মহামায়া তোরই মায়া”—এই কথার দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সংসারের সবচেয়ে প্রিয় সম্পর্কগুলিও মহামায়ার সৃষ্টি। এই সম্পর্কগুলি মিথ্যা নয়, কিন্তু এগুলোর প্রতি মানুষের মালিকানাবোধ ও চিরস্থায়ী অধিকারবোধই মায়ার বন্ধন সৃষ্টি করে। শেষে ভক্ত নিজেকে মায়ের “লীলার পুতুল” বলে স্বীকার করেছেন। তিনি মায়ের কাছে প্রার্থনা করছেন— যেন তাঁকেএ ই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করার শক্তি দেওয়া হয় যে, তিনি স্বাধীন কর্তা নন; তিনি মহামায়ার বিশ্বলীলারই একটি ক্ষুদ্র অংশ।  
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩) মাসে,  টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ৭৮০ সংখ্যক গান।
  • রেকর্ড: টুইন [অক্টোবর ১৯৩৬ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩)। এফ টি. ৭৬। শিল্পী: আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। সুর: নজরুল ইসলাম] [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: ইদ্‌রিস আলী  [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, দ্বাবিংশ খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা ভাদ্র, ১৪০৭/ সেপ্টেম্বর, ২০০০ খ্রিষ্টাব্দ] ২২ সংখ্যক গান। [নমুনা]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। আত্মনিবেদন
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয়
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: মা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।