(মা) খড়গ নিয়ে মাতিস রণে (maa khorgo niye matish)
(মা) খড়গ নিয়ে মাতিস রণে নয়ন দিয়ে বহে ধারা (মা)
(এমন) একাধারে নিষ্ঠুরতা কৃপা তোরই সাজে তারা॥
তোর করে অসুর-মুণ্ডরাশি
অধরে না ধরে হাসি
জানিস্ মরলে তোর আঘাতে তোরই কোলে যাবে তারা॥
মা দুই হাতে তোর বর ও অভয় আর দু’হাতে মুণ্ড অসি,
ললাটে তোর পূর্ণিমা-চাঁদ, কেশে কৃষ্ণা চতুর্দ্দশী।
জননী-প্রায় আঘাত করে
দিস্ মা দোলা বক্ষে ধ’রে
পাপ-মুক্ত করার ছলে অসুর বধিস ভব-তারা ১॥
১, ভব-তারা শব্দের আভিধানিক অর্থ নেই। সম্ভবত শব্দটি হবে ভব-দারা।
ভবের (শিব) দারা (পত্নী)। ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। শিবের স্ত্রী অর্থে- ভব-দারা, ভবানী, ঈশানী। দুর্গা।
- ভাবসন্ধান: দেবীর ভয়ংকর সংহাররূপের অন্তরেও মাতৃস্নেহ ও অসীম করুণা বিরাজমান। তিনি খড়্গ ধারণ করে অশুভকে বিনাশ করেন, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়—পাপমুক্তি ও কল্যাণসাধন। তাই তিনি একই সঙ্গে কঠোর শাস্তিদাত্রী এবং স্নেহময়ী জননী, সংহারকারিণী এবং পরম করুণাময়ী মা। তাঁর আঘাতও শেষ পর্যন্ত সন্তানের মঙ্গলের জন্য, আর তাঁর কাছে মৃত্যুও পরিণত হয় মাতৃকোলে আশ্রয় লাভে। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে দেবী তারা বা কালীর এক অপূর্ব দ্বৈত রূপ তুলে ধরা হয়েছে। তিনি একই সঙ্গে রণরঙ্গিণী ও স্নেহময়ী জননী, সংহারকারিণী ও করুণাময়ী। বাহ্যদৃষ্টিতে তাঁর হাতে খড়্গ, তাঁর সামনে অসুরবধের ভয়ংকর দৃশ্য; কিন্তু অন্তরে তিনি অসীম মমতাময়ী মা।
গানের শুরুতেই কবি বলেছেন 'খড়গ নিয়ে মাতিস রণে, নয়ন দিয়ে বহে ধারা'। অর্থাৎ মা একদিকে হাতে অস্ত্র নিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, অন্যদিকে তাঁর চোখ থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছে। এই দুই বিপরীত ভাব 'নিষ্ঠুরতা ও কৃপা' একই সঙ্গে কেবল দেবীমূর্তিতেই এমন সুন্দরভাবে মিলিত হতে পারে। তাঁর কঠোরতা আসলে নিষ্ঠুরতার জন্য নয়; তা অশুভের বিনাশ ও জীবের কল্যাণের জন্য।
দেবী অসুরদের মুণ্ডচ্ছেদ করলেও তাঁদের প্রতি বিদ্বেষবশত হাসেন না। কারণ তিনি জানেন, তাঁর হাতে মৃত্যুবরণ করলেও শেষ পর্যন্ত সেই জীব তাঁরই কোলে আশ্রয় পাবে। এখানে দেবীর সংহারকর্মের মধ্যেও মাতৃস্নেহের গভীরতা প্রকাশিত হয়েছে। মা সন্তানকে শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু তাকে পরিত্যাগ করেন না।
গানটির পরবর্তী অংশে দেবীর চার হাতের প্রতীকী তাৎপর্য ফুটে উঠেছে। দুই হাতে তিনি বর ও অভয় প্রদান করছেন। অর্থাৎ ভক্তদের আশীর্বাদ ও নির্ভয়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অপর দুই হাতে রয়েছে মুণ্ড ও অসি বা খড়্গ- যা অশুভ, পাপ ও অহংকার বিনাশের প্রতীক। অর্থাৎ দেবীর এক রূপ রক্ষা করে, আরেক রূপ অকল্যাণকে ধ্বংস করে।
'ললাটে তোর পূর্ণিমা-চাঁদ, কেশে কৃষ্ণা চতুর্দ্দশী' -এই চিত্রকল্পে দেবীর রূপের মধ্যে আলো ও অন্ধকারের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। ললাটের পূর্ণিমার চাঁদ তাঁর শান্ত, সৌম্য ও মঙ্গলময় রূপের প্রতীক; আর কৃষ্ণবর্ণ কেশ অমাবস্যার পূর্ববর্তী গভীর অন্ধকারের মতো তাঁর ভয়ংকর ও রহস্যময় শক্তিকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ দেবীর মধ্যেই আলো ও অন্ধকার, সৌন্দর্য ও ভয়ংকরতা- উভয়ের মিলন।
গানটির শেষাংশে কবি দেবীর সংহারকর্মকে একেবারে মাতৃসুলভ দৃষ্টিতে দেখেছেন। যেমন মা কখনো সন্তানের মঙ্গলের জন্য কঠোর শাসন করেন, তেমনি দেবীও অসুরকে আঘাত করেন। কিন্তু সেই আঘাতের উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা নয়; পাপ থেকে মুক্তি দেওয়া। অসুরবধের পরও তিনি সেই সন্তানকে নিজের বক্ষে ধারণ করেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৫) মাসে, এইচএমভি গানটির প্রথম রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ৩৮ বৎসর ছিল ৬ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৮৩৫। পৃষ্ঠা: ২৫৫-২৫৬]
- বেতার:
- রক্তজবা । (গীতিচিত্র),। রচয়িতা: অবিনাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২০ নভেম্বর ১৯৩৯ (সোমবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৩৪৬)। সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৬.১০।
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ, ২২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৮৭৭
- নজরুল যখন বেতারে। আসাদুল হক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমী। মার্চ ১৯৯৯। পৃষ্ঠা: ৭৬।
- সূত্র:
- রক্তজবা । (গীতিচিত্র),। রচয়িতা: অবিনাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২০ নভেম্বর ১৯৩৯ (সোমবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৩৪৬)। সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৬.১০।
-
- রেকর্ড: এইচএমভি [ডিসেম্বর ১৯৩৮ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৫)। এন ১৭২২৭। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর: নজরুল ইসলাম। রাগ: বাগেশ্রী, তাল: তেওড়া] [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- আহসান মুর্শেদ। [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি ছেচল্লিশতম খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট । ফাল্গুন ১৪২৫/ফেব্রুয়ারি ২০১৯] পৃষ্ঠা: ৬৭-৬৯। [নমুনা]
- পর্যায়: