মা ব্রহ্মময়ী জননী মোর

মা ব্রহ্মময়ী জননী মোর (মোরে) অব্রাহ্মণ কে বলে।
শ্যামা নামের জঠরে মোর নবজন্ম ভূতলে॥
শ্রী চণ্ডিকারে মা বরে রে আমি হলাম দ্বিজ,
[আমি দ্বিতীয় বার জন্ম নিলাম
চণ্ডিকারে মা বলে আমি দ্বিতীয় বার জন্ম নিলাম]
মা আদর করে নাম দিয়েছেন পুত্র মনসিজ।
রুদ্রাক্ষ মালার যজ্ঞোপবীত মা পরালেন মোর গলে॥

মোরে কে কবে অস্পৃশ্য বলে দিয়েছিল গালি
আমি কেঁদেছিলাম মা বলে, তাই মা হল মোর কালি
মা হলেন ভদ্রকালী।
যারা আমায় ঘৃণা করেছিল আগে
আজ মায়ের কোলে তাহাদেরই ডাকি অনুরাগে,
চণ্ডাল আজ কমল হয়ে ফুটল মা’র চরণ-তলে॥

  • ভাবসন্ধান: মাতৃভক্তির মাধ্যমে জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা ও সামাজিক ঘৃণার সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি এবং সকল মানুষের সমান মর্যাদার ঘোষণা- এই গানের মূল বিষয়। এখানে দেবী কালী বা চণ্ডী কেবল পৌরাণিক দেবী নন—তিনি এমন এক বিশ্বজননী, যাঁর সন্তান হওয়ার অধিকার সকল মানুষের সমান। গানটির বাণীতে শাক্তভক্তি ও গভীর মানবতাবাদ একাকার হয়ে গেছে। 

    “মা ব্রহ্মময়ী জননী মোর, মোরে অব্রাহ্মণ কে বলে”—এই পঙ্ক্তিতে কবি প্রচলিত জন্মগত জাতিপরিচয়ের বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভক্ত বলছেন, যাঁর জননী স্বয়ং ব্রহ্মময়ী, তাঁকে আবার কে হীনজাত বা অব্রাহ্মণ বলে অপমান করতে পারে? এখানে ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দটি শুধু সামাজিক জাতিবিশেষের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; এর গভীরে রয়েছে আধ্যাত্মিক নবজন্মের ধারণা। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা জন্মপরিচয়ে নয়, বরং তার আত্মিক চেতনা ও মানবিক পরিচয়ে—এই ভাবটিই প্রধান হয়ে উঠেছে। “শ্যামা নামের জঠরে মোর নবজন্ম ভূতলে”—মাতৃনাম গ্রহণের মধ্য দিয়েই ভক্ত যেন নতুন জীবন লাভ করেছেন। এটি শারীরিক জন্ম নয়, আত্মিক জন্ম। যিনি আগে সমাজের চোখে অপমানিত ও অবহেলিত ছিলেন, তিনি মায়ের আশ্রয়ে এসে এক নতুন মর্যাদা ও পরিচয় লাভ করেছেন।

    এই কারণেই তিনি গানে উল্লেখ করেছেন— “চণ্ডিকারে মা বলে রে আমি হলাম দ্বিজ”। ‘দ্বিজ’ অর্থ দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণকারী। কিন্তু এখানে দ্বিতীয় জন্ম কোনো বিশেষ জাতিগত অধিকারের ফল নয়; বরং মাকে ‘মা’ বলে ডাকার মধ্য দিয়ে মানুষের আত্মার নবজাগরণ ঘটেছে। ভক্তের অহঙ্কার যে, “রুদ্রাক্ষ মালার যজ্ঞোপবীত মা পরালেন মোর গলে”। এখানে যজ্ঞোপবীত সামাজিক ব্রাহ্মণ্যাধিকারের প্রতীক হিসেবে এসেছে। কিন্তু মা নিজেই ভক্তকে এই পবিত্রতার অধিকার দিয়েছেন। অর্থাৎ মানুষের পবিত্রতা কোনো সমাজপ্রদত্ত পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়; পরমসত্তার সন্তান হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সেই মর্যাদা নিহিত।

    অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে মাতৃশক্তির প্রতিবাদ গানের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে— “মোরে কে কবে অস্পৃশ্য বলে দিয়েছিল গালি, আমি কেঁদেছিলাম মা বলে, তাই মা হল মোর কালি।” সমাজ যাঁকে ‘অস্পৃশ্য’ বলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, সেই অপমানিত মানুষ আশ্রয় পেয়েছেন মায়ের কাছে। তাঁর কান্নার উত্তরে ভয়ংকরী কালীও হয়ে উঠেছেন ভদ্রকালী—অর্থাৎ সন্তানের প্রতি স্নেহময়ী ও মঙ্গলময়ী মা।

    এখানে একটি গভীর সত্য প্রকাশিত হয়েছে—মানুষের সমাজ কাউকে ঘৃণা করতে পারে, কিন্তু বিশ্বজননীর কাছে কোনো সন্তান অস্পৃশ্য নয়। ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা যাঁরা একদিন তাঁকে ঘৃণা করেছিলেন, তাঁদের প্রতিও কবির কোনো প্রতিহিংসা নেই। বরং তিনি বলেন— “আজ মায়ের কোলে তাহাদেরই ডাকি অনুরাগে।” এখানেই গানটির মানবতাবাদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মা যেমন সব সন্তানকে সমানভাবে কোলে নেন, তেমনি ভক্তও তাঁর মাতৃপ্রেমের মধ্যে সকল ঘৃণা ও বিভেদ ভুলে যেতে চান। অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে ঘৃণা নয়, সকলকে একই মাতৃকোলে আহ্বান জানাচ্ছেন।

    ‘চণ্ডাল আজ কমল হয়ে ফুটল’ শেষ পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর। যাকে সমাজ ‘চণ্ডাল’ বলে ঘৃণা ও অপমানের অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছিল, মায়ের চরণে এসে সেই মানুষই কমলের মতো পবিত্র ও সুন্দর হয়ে ফুটে উঠেছে। এখানে ‘কমল’ আত্মমর্যাদা, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতীক। অর্থাৎ মায়ের চরণে এসে সামাজিক পরিচয়ের সব কলঙ্ক মুছে যায়। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জাতি নয়—সে বিশ্বজননীর সন্তান।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৩০৭১। পৃষ্ঠা: ৯৪০]
    • দেবীস্তুতি [দশমহাবিদ্যার অংশ। পাণ্ডুলিপি থেকে নিতাই ঘটক কর্তৃক সংকলিত]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। বন্দনা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।