দোষ দিয়ো না প্রবীণ জ্ঞানী (dosh dio na probin gyani)
দোষ দিয়ো না প্রবীণ জ্ঞানী হেরি' খারাব শারাব-খোর।
তাহার যে পাপ তারি একার, হয় না লেখা নামে তোর॥
মন্দ ভালো যা হই আমি, তুই করে যা কাজ আপন,
কাট্ব তাহাই- যে ফসলের বীজ বুনেছি ক্ষেত্রে মোর॥
হউক মসজিদ হউক মন্দির প্রেমের গতি সবখানেই,
গাইছে একই প্রেমের গীতি- কেউ সজাগ কেউ নেশায় টোর॥
জন্মদিনের ললাট-লেখা হবেই হবে পূর্ণ মোর,
কেউ জানে না পর্দা-আড়ে আলোক না সে আঁধার ঘোর॥
শেয়র : ভেঙেছি দ্বার, ফিরব না আর পুণ্যশালার জেল-খানায়,
আদিম পিতা আদামও ত স্বর্গ পেয়ে ছাড়ল তায়।
পুণ্যফলের ভরসা করে কাটিয়ো না কেউ বৃথাই কাল,
তোমার ললাট-লেখার বন্ধু, তুমিই নহ ওয়াকিফ্-হাল।
বেহেশ্তের ঐ কুঞ্জ-কানন মধুর, তবু হুঁশিয়ার!
ঝাউ-এর ছায়া, তরীর কিনার – তাই নিয়ে থাক্ সুখ-বিভোর॥
মরণ-ক্ষণে যদি, হাফিজ, রয় হাতে তোর শারাব-জাম
মলিন ধরা হতে তোরে তুরন্ত্ নেবে বেহেশ্ত-দোর॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি মানুষের বাহ্যিক আচরণ দেখে তাকে বিচার না করার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তিকে তার দোষ বা দুর্বলতার জন্য অবজ্ঞা করা উচিত নয়, কারণ প্রত্যেক মানুষ নিজ নিজ কর্মের ফল ভোগ করে। অন্যের পাপের দায় আরেকজনের ওপর বর্তায় না। মানুষ নিজের কর্মের বীজই জীবনের ক্ষেত্রে বপন করে এবং পরবর্তীতে সেই কর্মফলই লাভ করে।
কবির মতে- সত্যিকারের প্রেম ও পরমসত্তার পথ মসজিদ-মন্দিরের ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে। সব ধর্ম ও উপাসনালয়ের মূল শিক্ষা প্রেম, যদিও কেউ সচেতনভাবে সেই প্রেম উপলব্ধি করে, আবার কেউ তা নেশাগ্রস্তের মতো আবেগের মাধ্যমে অনুভব করে। বাহ্যিক রূপ ভিন্ন হলেও অন্তর্নিহিত সত্য এক।
তিনি মনে করেন- মানুষের ভাগ্যে যা লিখিত আছে, তা একদিন না একদিন পূর্ণ হবেই। কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কেউ নিশ্চিতভাবে কিছু জানে না; পর্দার আড়ালে আলো না অন্ধকার অপেক্ষা করছে, তা মানুষের অজানা। তাই অন্যকে বিচার করার আগে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
এই গানে কবি ধর্মীয় পুণ্যলাভের সংকীর্ণ ধারণার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, কেবল স্বর্গপ্রাপ্তির আশায় জীবন কাটানো অর্থহীন। আদমও স্বর্গে অবস্থান করেও পৃথিবীতে এসেছিলেন; অতএব কেবল স্বর্গের লোভ নয়, জীবনের গভীর সত্য উপলব্ধিই প্রধান। মানুষ নিজের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত নয়, তাই অহংকার বা আত্মতৃপ্তির কোনো অবকাশ নেই
গানটির শেষে হাফিজের প্রসঙ্গ এনে কবি সুফি ভাবধারার একটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্য উপস্থাপন করেছেন। এখানে ‘শারাব’ বা ‘মদ’ কেবল জাগতিক পানীয় নয়; এটি পরমসত্তার প্রতি প্রেম, আত্মবিস্মৃতি ও আধ্যাত্মিক উন্মাদনার প্রতীক। অর্থাৎ যে ব্যক্তি মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত পরম প্রেমে নিমগ্ন থাকে, সে ঈশ্বরের কৃপা ও নৈকট্য লাভ করে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত 'নজরুল গীতিকা' গ্রন্থে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৩ মাস। ওমর খেয়ামের দুটি রুবাই- নিয়ে এই গানটি তৈরি করা হয়েছিল।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। দীওয়ান-ই হাফিজ গীতি। ৭। গারা-ভৈরবী- আদ্ধাকাওয়ালী। পৃষ্ঠা ১৫ ]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল গীতিকা। দীওয়ান-ই হাফিজ গীতি। ১৫। খাম্বাজ-পিলু- পোস্তা। পৃষ্ঠা: ১৭৯]
- নজরুল-গীতিকা
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৮২৪]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। সুফিবাদী। আত্মদর্শন