জানি আমার সাধনা নাই আছে তবু সাধ (jani amar shadhona nai)

       জানি আমার সাধনা নাই আছে তবু সাধ।
       তুমি আপনি এসে দেবে ধরা দূর-আকাশের চাঁদ॥
                    চকোর নহি মেঘও নহি
                    আপন ঘরে বন্দী রহি'
         আমি শুধু মনকে কহি কাঁদ্ নিশি দিন কাঁদ্॥
         কূল-ডুবানো জোয়ার কোথা পাব হে সুন্দর?
         হে চাঁদ আমি সাগর নহি পল্লী-সরোবর।
                    নিশীথ রাতে আমার নীরে,
                    প্রেমের কুমুদ ফোটে ধীরে,
মোর   ভীরু প্রেম যেতে নারে ছাপিয়ে লাজের বাঁধ॥

  • ভাবসন্ধান: সাধক কবি তাঁর সাধনাবিহীন যাপিত জীবনে পরমসত্তার সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আকুল।  তিনি জানে তাঁকে পাওয়ার যথার্থ সাধনা তাঁর নেই। এই গানে সাধক কবির বিনয়ী হৃদয়ের অন্তর্লীন প্রেম ও আধ্যাত্মিক আকুলতার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই গানে উপস্থাপিত হয়েছে- পরমসত্তার কাছে তাঁর আত্মনিবেদনের আকুলতা।

    কবি জানেন তেমন সাধনা বা যোগ্যতা তাঁর নেই, তবু তাঁর সাধ আছে পরমসুন্দর রূপী পরমসত্তাকে পাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা। কবির মনে দুরাশা জাগে, হয়তো সেই পরমসুন্দর  নিজেই এসে একদিন  দূর আকাশের চাঁদের মতো তাঁর কাছে হঠাৎ ধরা দেবেন।

    কবি তাঁর সাধনায় একাগ্রতার অভাব জানেন। চকোর যেমন চাঁদের আলো পান করার জন্য ব্যাকুল হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, তেমনটা তিনি নন। আকশের বুকে ভেসে বেড়ানো মেঘের মতো স্বাধীন নন, যে তিনি উচ্চ আকাশে উদ্ভাসিত চাঁদের (প্রিয় সত্তার ) কাছে পৌঁছাতে পারেন। বিনয়ী কবি বলেন- তিনি সাধারণ মানুষ, তাই নিজের ঘরেই বন্দী হয়ে আছেন। পরমসত্তার সান্নিধ্য পাওয়া একমাত্র উপায় হিসেবে নিজের মনকে শোনান, বলেন- 'রাতদিন কাঁদো, আকুল হও, প্রার্থনা করো'।

    তাঁর আত্মজিজ্ঞাসা পরম সুন্দরের সাধনার প্রবল জোয়ার কোথায় পাবেন তিনি। যে জোয়ারে সকল প্রতিবন্ধকতার বাঁধ ভেঙে যায়,  হৃদয়কে প্লাবিত করে প্রেমের জোয়ার। পরক্ষণে কবি ভাবেন- তিনি তো বিশাল সাগর নন। তিনি ছোট্ট পল্লীর একটি শান্ত সরোবরের মতো। তবু সেই ছোট সরোবরের বুকেও- অজ্ঞনতা ও অ-প্রেমের মাঝে প্রেমের কুমুদ ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে। তাঁর প্রেম খুব লাজুক ও ভীরু। তাই তিনি লজ্জার বাঁধ অতিক্রম করে নিজেকে পরমসত্তার কাছে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন না। তাঁর সে গোপন প্রেম অন্তরের গভীরতলে  শুধু নীরবে প্রস্ফুটিত হয়।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৩) মাসে টুইন  রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৮ মাস।
  • গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্‌ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ৪৩৯।

  • রেকর্ড: টুইন [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৩)। এফটি ৪৭৭৪। শিল্পী: মাধবী দাশগুপ্তা।] [শ্রবণ নমুনা]

  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি চতুর্দশ খণ্ড(নজরুল ইন্সটিটিউট)। ১৩ সংখ্যক গান। রেকর্ডে মাধবী দাশগুপ্তার গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে।  [নমুনা]
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। আত্মনিবেদন
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।