জাগে না সে যোশ ল'য়ে আর মুসলমান (jage na she josh loye ar musolman)

জাগে না সে যোশ ল'য়ে আর মুসলমান।
হায় করিল জয় যে তেজ ল'য়ে দুনিয়া জাহান॥
যাহার তক্‌বির ধ্বনি, তক্‌দির বদলালো দুনিয়ার
না-ফরমানের জামানায় আনিল ফরমান খোদার,
হায় পড়িয়া বিরান আজি সে গুল্-গুলিস্তান॥
নাই সাচ্চাই সিদ্দিকের, উমরের নাহি সে ত্যাগ আর
নাহি আর বেলালের ঈমান, নাহি আলীর জুলফিকার,
হায় নাহি আর সে জেহাদ-লাগি' বীর শহীদান॥
নাহি আর বাজুতে কুওত্‌, নাহি খালেদ, মুসা, তারেক
নাহি বাদ্‌শাহী তখ্‌তে তাউস্‌, ফকির আজ দুনিয়ার মালেক
হায় ইস্‌লাম কেতাবে শুধু মুসলিম গোরস্তান॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি মুসলিম উম্মাহর বর্তমান দুরবস্থা ও অতীতের গৌরবের মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য তুলে ধরেছেন। কবি গভীর দুঃখ ও হতাশার সুরে বলছেন যে,  যে জোশ (উদ্দীপন) নিয়ে একসময় মুসলমানরা পুরো দুনিয়া জয় করে ফেলেছিল, আজ আর সেই জোশ, সেই উৎসাহ-উদ্যম আর নেই। 

    যে মুসলমানদের তাকবীরের (আল্লাহু আকবার ধ্বনির) আওয়াজে দুনিয়ার ভাগ্য বদলে যেত, যারা অবাধ্যতা ও অজ্ঞতার যুগে (না-ফরমানির জামানা) আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই গোলাপ-বাগিচার মতো সৌন্দর্যময় ইসলামী সভ্যতা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

    আজ আর নেই সেই গুণাবলি যা প্রথম যুগের মুসলিম বীরদের ছিল। সিদ্দিক (আবু বকর)-এর মতো সত্যবাদিতা ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা নেই, উমর (রা.)-এর মতো ত্যাগ ও ন্যায়পরায়ণতা নেই, বেলাল (রা.)-এর মতো অটল ঈমান নেই, আলী (রা.)-এর জুলফিকারের মতো বীরত্ব ও জেহাদের প্রেরণা নেই। নেই সেই যোদ্ধা- খালেদ বিন ওয়ালিদ, মুসা বিন নুসাইর, তারিক বিন জিয়াদের মতো বীর। যাদের বাহুতে ছিল অপরাজেয় উদ্দীপনার শক্তি। আজ সেই বাদশাহী সিংহাসন নেই, তাউস (ময়ূর সিংহাসন) নেই। বরং মুসলমান আজ দুনিয়ার ফকির, ভিখারি হয়ে গেছে। ইসলাম শুধু কিতাবের পাতায় আর কবরস্থানে (গোরস্তানে) সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নেই আর জীবন্ত শক্তি, জাগরণ, বিজয়ের প্রেরণা।

    মূলত একদা যে মুসলিম জাতি তাকবীরের ধ্বনিতে দুনিয়া জয় করেছিল, আজ সেই জাতি নিজের ঐতিহ্য, ঈমান, ত্যাগ, বীরত্ব সব হারিয়ে নিষ্ক্রিয় ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। কবি এই দুর্দশা দেখে ব্যথিত, এবং পরোক্ষভাবে মুসলমানদের জাগিয়ে তুলতে, অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনতে আহ্বান জানাচ্ছেন। 
  • রচনাকাল ও স্থান:   গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ অক্টোবর (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯), 'জুলফিকার' নামক গীতি-গ্রন্থে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • জুলফিকার
      • প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২ (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)। ভৈরবী-কার্ফা]
      • নজরুল রচনাবলী,  জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা।  জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭। জুলফিকার। ৪ সংখ্যক গান। ভৈরবী-কার্ফা। পৃষ্ঠা: ২৯২
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ৫৭৬ সংখ্যক গান।
       
  • রেকর্ড: টুইন [নভেম্বর ১৯৩৩ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪০)]। এফটি ২৯৬৯। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ। ] [শ্রবণ নমুনা]

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।