দাও শৌর্য,দাও ধৈর্য,হে উদার নাথ (dao shourjo, dao dhoirjo, he udaro nath)

দাও শৌর্য, দাও ধৈর্য, হে উদার নাথ,
                             দাও প্রাণ।
দাও অমৃত মৃত জনে,
দাও ভীত-চিত জনে,শক্তি অপরিমাণ।
                            হে সর্বশক্তিমান॥
দাও স্বাস্থ্য,দাও আয়ু,
স্বচ্ছ আলো,মুক্ত বায়ু,
দাও চিত্ত অ-নিরুদ্ধ,দাও শুদ্ধ জ্ঞান।
                        হে সর্বশক্তিমান॥
দাও দেহে দিব্য কান্তি,
দাও গেহে নিত্য শান্তি,
দাও পুণ্য প্রেম ভক্তি,মঙ্গল কল্যাণ।
ভীতি নিষেধের ঊর্ধে স্থির,
রহি যেন চির-উন্নত শির
যাহা চাই যেন জয় করে পাই,গ্রহণ না করি দান।
                                হে সর্বশক্তিমান॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটি সর্বশক্তিমান পরমসত্তার কাছে মানবজীবনের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার জন্য এক মহৎ প্রার্থনা উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি কবির কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণের আবেদন নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ও মর্যাদাপূর্ণ মানবজীবন গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।

    গানের সূচনায় কবি পরমসত্তার কাছে শৌর্য, ধৈর্য ও প্রাণশক্তি প্রার্থনা করেছেন। এখানে 'শৌর্য- হলো মানুষের সাহস ও সংগ্রামী চেতনার প্রতীক, আর 'ধৈর্য' হলো- প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অবিচল থাকার শক্তির প্রতীক। কবির মনে করেন, জীবনের নানা বাধা ও সংকট অতিক্রম করার জন্য এই দুই গুণ অপরিহার্য। পাশাপাশি তিনি মৃতপ্রায় ও হতাশ মানুষের জন্য অমৃতসম জীবনশক্তি এবং ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের জন্য অপরিমেয় সাহস ও শক্তি কামনা করেছেন। এর মাধ্যমে মানুষের অন্তর্নিহিত বাসনা ও সম্ভাবনাকে জাগ্রত করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।

    গানটির পরবর্তী অংশে কবি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, নির্মল আলো ও মুক্ত বায়ু প্রার্থনা করেছেন। এগুলো কেবল শারীরিক সুস্থতার উপকরণ নয়; বরং একটি সুন্দর ও কল্যাণময় জীবনের ভিত্তি। একই সঙ্গে তিনি মুক্ত ও অবারিত চিত্ত এবং শুদ্ধ জ্ঞান কামনা করেছেন। এখানে 'অ-নিরুদ্ধ চিত্ত' বলতে সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে। আর 'শুদ্ধ জ্ঞান' হলো- সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলার আলোকবর্তিকা।

    গানের পরবর্তী অংশে কবি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের মঙ্গল কামনা করেছেন। তিনি দেহে দিব্য কান্তি, গৃহে স্থায়ী শান্তি এবং হৃদয়ে পুণ্য, প্রেম ও ভক্তির বিকাশ প্রার্থনা করেছেন। এখানে 'দিব্য কান্তি' কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়; বরং অন্তরের পবিত্রতা ও চরিত্রের দীপ্তির প্রতীক। 'নিত্য শান্তি' পারিবারিক সম্প্রীতি ও মানসিক প্রশান্তির প্রতীক, আর প্রেম ও ভক্তি মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

    গানের শেষাংশে কবি আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনচেতা জীবনের আদর্শ তুলে ধরেছেন। তিনি চান, ভয় ও নিষেধের ঊর্ধ্বে উঠে যেন সর্বদা উন্নত শিরে জীবনযাপন করতে পারেন। এখানে উন্নত শির আত্মবিশ্বাস, মর্যাদাবোধ ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক। তিনি আরও প্রার্থনা করেছেন, জীবনে যা কিছু অর্জন করবেন, তা যেন নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম ও সাধনার দ্বারা অর্জিত হয়; অনুগ্রহ বা ভিক্ষারূপে নয়। 'যাহা চাই যেন জয় করে পাই, গ্রহণ না করি দান'- এই পঙ্ক্তিতে আত্মনির্ভরতা, কর্মপ্রেরণা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৪১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪) মাসে,  গানটি গানের মালা প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৫ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ: গানের মালা
    • প্রথম সংস্করণ [আশ্বিন ১৩৪১ বঙ্গাব্দ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ভজন। ৮০। ]
    • নজরুল রচনাবলী ষষ্ঠ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, জুন ২০১২। গানের মালা ৭৯। ভজন। পৃষ্ঠা ২৩০-২৩১]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৬০০]
  • পত্রিকা:
    • চিত্রালী [জ্যৈষ্ঠ ১৩৪২ (মে-জুন ১৯৩৫)। জগৎঘটককৃত স্বরলিপি-সহ মুদ্রিত হয়েছিল।]
    • সবুজ বাঙলা [অগ্রহায়ণ ১৩৪১ (নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৩৪)]
       
  • রেকর্ড: এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৪ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪১)। শিল্পী: আঙ্গুরবালা ও ধীরেন দাস। এন ৭২৯০] [শ্রবণ নমুনা]
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
  • সুরকার: নজরুল ইসলাম
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। প্রার্থনা
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
    • রাগ: হেমকল্যাণ
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: গা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।