জয় মর্ত্যে অমৃতবাদিনী চির-আয়ুষ্মতী (joy mortye omritobadini chiro-ayushmoti)

 জয় মর্ত্যে অমৃতবাদিনী চির-আয়ুষ্মতী!
 জয় নারী-রূপা দেবী পুণ্যশ্লোকা সতী!
 জয় অগ্নিহোত্রী অয়ি দীপ্তা উগ্রতপা জ্যোতির্ময়ী।
 জয় সুরলোক-বাঞ্ছিতা, সতী মহিমার গীতা, মৃত্যু-জয়ী।
 জয় সীমন্তে নবারুণ, ধরণী অরুন্ধতী॥
 চির-শুদ্ধাচারিণী চির-পবিত্রা সুমঙ্গলা!
 চির-অবৈধব্য-যুতা তুমি চিরপূজ্যা মা, নহ অবলা।
 মা গো যুগে যুগে চির-ভাস্বর তুমি উদীচী জ্যোতি॥
 তব সীমান্ত-সিন্দূর মাগে, মা গো, বিশ্ব-বধূ;
 মা গো মৃত্যুঞ্জয়ী তব তপস্যা দাও, দাও আশিস-মধু!
 সব কন্যা জায়া যাচে তব বর, করে প্রণতি॥

  • ভাবসন্ধান: মন্মথ রায় রচিত 'সাবিত্রী' নাটকের শেষাংশে আনন্দ-দৃশ্যের গান। সাবিত্রী তাঁর পতিভক্তির একনিষ্ঠায়, যমের হাত থেকে স্বামী সত্যবানকে মৃত্যু রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার পর, বনবাসিনীগণ সাবিত্রীর সীমন্তে সিঁদুর পরিয়ে দেন এবং সাবিত্রী-মঙ্গল গীত পরিবেশন করেন। এই গানটি মূলত বনবাসীগণের সাবিত্রী-বন্দনা।

    গানটির প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে তাঁর প্রতি পরম ভক্তিতে নানা রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। মর্ত্যের অমৃতবাদিনী (মধুরভাষিণী) চির-আয়ুষ্মতী এবং নারী-রূপা দেবী রূপে পুণ্যশ্লোকা সতী নামে জয়ধ্বনি দেওয়া হয়েছে। তিনি অগ্নিহোত্রী স্বরূপ। উল্লেখ্য, যিনি প্রতিদিন নিয়ম করে পবিত্র অগ্নি রক্ষা করেন এবং তাতে ঘৃতাহুতি বা হোম করেন, তিনিই অগ্নিহোত্রী। তাই তিনি যজ্ঞের অগ্নির ন্যায় দীপ্ত, উগ্রতপস্যায় জ্যোতির্ময়ী দেবী। দেবলোকেও তাঁর উপস্থিতি কামনা করা হয়, তাই তিনি সুরলোক-বাঞ্ছিতা। সতীত্বের মহিমাই তাঁর জয়গাঁথা, কারণ তিনি সতীত্বের অক্ষিপরীক্ষায় মৃত্যুকেও জয় করেছেন।

    তাঁর নবারুণের মতো সিঁদুর রক্তিম আভায় রঞ্জিত সিঁথি হয়ে রয় সতীত্বের মহিমায় বিভাময় হয়ে। তিনি ধরিত্রীসমা সহিষ্ণু এবং অপর এক সতী অরুন্ধতীর ন্যায় পতিব্রতা আদর্শ। তিনি চিরশুদ্ধাচারিণী, চিরপবিত্রা, চিরসুমঙ্গলা। তিনি মৃত্যুকে জয় করে স্বামীর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন, তাই তাঁর কখনও বৈধব্য নেই। তাই তাঁকে বলা হবেছে চির-অবৈধব্য-যুতা। তিনি পবিত্রা বলেই সর্বদা পূজ্য। যমের মুখোমুখী হয়েছিলেন সাহসিকা রূপে তাই তিনি শক্তির প্রতিমূর্তি। যেন তিনি মাতৃরূপিণী- যুগে যুগে উদীচী জ্যোতির মতো চিরভাস্বর। তাই বিশ্বের সকল বধূ তাঁর সীমান্ত-সিন্দূরের আশীর্বাদ কামনা করে।  গানটির শেষে বনদেবীরা মাতৃরূপিণী সাবিত্রীর কাছে এই আশীর্বাদ চেয়েছেন- যেন তিনি তাঁদের তাঁর তপস্যার শক্তি দান হিসেবে- আশীর্বাদের মধুর বর দান করেন।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ মে (শনিবার ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৮), মন্মথ রায় রচিত 'সাবিত্রী' নাটকটি কলকাতার নাট্যনিকেতনে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল। এই নাটকে এই গানটি ছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩২ বৎসর ১ মাস।
     
  • মঞ্চ: নাট্যনিকেতন। ৩০ মে ১৯৩১ (শনিবার ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৮)।  মন্মথ রায়ের রচিত নাটক। এই নাটকের সঙ্গীত রচয়িতা এবং সুরকার ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম
     
  • গ্রন্থ:
    • সাবিত্রী
      • মন্মথ রায়-কর্তৃক রচিত নাটক। [১৩৩৮ বঙ্গাব্দের ১৬ই জ্যৈষ্ঠ মঞ্চস্থ হয়েছিল। আনন্দ দৃশ্য। বনবাসিগণের গান।]
      • মন্মথ রায় নাট্যগ্রন্থাবলী দ্বিতীয় খণ্ড [জগদ্ধাত্রী পূজা ১৩৫৮। ২৫শে নভেম্বর ১৯৫১। সাবিত্রী। আনন্দ দৃশ্য। বনবাসিগণের গান।]
    • চন্দ্রবিন্দু
      • প্রথম সংস্করণ [সেপ্টেম্বর ১৯৩১, আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ।]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮, মে ২০১১। চন্দ্রবিন্দু। ৩৫। ইমন-কাওয়ালি। পৃষ্ঠা: ১৮০]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ১৪৭০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৩৭৭।
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম। বন্দনা। সাবিত্রী

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।