নমো নমঃ রাম-খুঁটি (nomo nomoh ram-khuti)

নমো নমঃ রাম-খুঁটি!
তুমি গাদিয়া বসেছ আমাদের বুকে, সাধ্য নাই যে উঠি॥
তুমি নির্বিকার হে পরম পুরুষ
আপনাতে আছ আপনি বেহুঁশ,
তব বাঁধন ছিঁড়িতে বৃথা টানটানি এই বৃথা মাথা কুটাকুটি॥
এই আইন কানুন আচার বিচার
বিধি ও নিষেধ স্ত্রীপরিবার
(বাংলায় যাকে বলে Wife)
শত নামে তুমি জগৎ মাঝার চাপিয়া আছ যে টুটি॥
কত রূপে তব লীলার প্রকাশ (রাম খুঁটো হে!)
কভু হও খুঁটো কভু হও বাঁশ,
কভু হাঁড়ি-কাঠ কভু ঘানি-গাছ ঘোরাও ধরিয়া ঝুঁটি॥
কখনো পাঁচনী-রুপে পিঠে পড় (ওরে বাবারে)
কখনো কঞ্চি, বাঁশ চেয়ে দড়
কভু গুঁতো কভু লাঠি (ওরে বাবারে)।
ঠুঁটো ত্রিভঙ্গ হে প্রভু, তোমার এই ভয়ে মোরা গুটিসুটি॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কবি ‘রাম-খুঁটি’ নামের একটি রূপকের মাধ্যমে মানুষের জীবনের নানা বন্ধন, সামাজিক নিয়ম-কানুন, সংসারের দায়-দায়িত্ব এবং অদৃশ্য নিয়তির শক্তিকে ব্যঙ্গ-রসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এখানে ‘রাম-খুঁটি’ কোনো সাধারণ খুঁটি নয়; এটি এমন এক প্রতীক, যা মানুষের বুকের ওপর চেপে বসে আছে—যার বন্ধন থেকে মানুষ সহজে মুক্ত হতে পারে না।

    গানের শুরুতেই কবি ব্যঙ্গ করে বলেন—হে রাম-খুঁটি, তুমি আমাদের বুকে এমনভাবে গেঁথে বসেছ যে তোমাকে সরানোর কোনো সাধ্য নেই। তুমি নির্বিকার, পরম পুরুষের মতো নিজের মধ্যেই স্থির হয়ে আছ; আর মানুষ তোমার বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যতই চেষ্টা করুক, তা যেন বৃথা মাথা কুটে মরার মতো।

    এখানে ‘রাম-খুঁটি’ আসলে মানুষের জীবনের সেইসব অদৃশ্য বন্ধনের প্রতীক, যা তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কবি বলেন—আইন-কানুন, আচার-বিচার, বিধি-নিষেধ, স্ত্রী-পরিবার ইত্যাদি নানা সামাজিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তুমি জগৎকে এমনভাবে চেপে ধরেছ যে মানুষের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে গেছে। মানুষ নিজের ইচ্ছামতো চলতে পারে না; তাকে নানা নিয়ম ও সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে হয়।

    পরবর্তী অংশে কবি ‘রাম-খুঁটি’র নানা রূপের কথা বলে হাস্যরস সৃষ্টি করেছেন। কখনো সে খুঁটি, কখনো বাঁশ, কখনো হাঁড়ি-কাঠ, কখনো ঘানি-গাছ—অর্থাৎ জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই বন্ধন নানা রূপ ধারণ করে। কখনো তা সংসারের ভার, কখনো কর্তব্যের চাপ, কখনো সামাজিক শাসন, আবার কখনো জীবনের কঠিন বাস্তবতা হয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে।

    'কখনো পাঁচনী-রূপে পিঠে পড়ে, কখনো কঞ্চি, বাঁশ, দড়া'- এই চিত্রগুলোর মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন, জীবনের এই অদৃশ্য শক্তি কখনো কোমলভাবে, আবার কখনো কঠোরভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ তার ভয়ে গুটিয়ে থাকে, যেন কোনো শাস্তির আশঙ্কায় নিজেকে সামলে চলে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।  ১৯৩৩ বঙ্গাব্দের এপ্রিল (চৈত্র ১৩৩৯-বৈশাখ ১৩৪০) মাসে, এ্‌ইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ৩৩ বৎসর ছিল ১০ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • গীতি-শতদল।
      • প্রথম সংস্করণ [বৈশাখ ১৩৪১। এপ্রিল ১৯৩৪। 'খুঁটোর ভয়']
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১।  গীতি-শতদল। গান সংখ্যা ৯৯। 'খুঁটোর ভয়'। পৃষ্ঠা ৩৪৩-৩৪৪]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ২৪০৮। পৃষ্ঠা: ৭৪০]
       
  • রেকর্ড: এইচএমভি [এপ্রিল ১৯৩৩ (চৈত্র ১৩৩৯-বৈশাখ ১৩৪০)]। এন ৭০৯৮। শিরোনাম: খুঁটোর ভয়। শিল্পী: হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
        
    এর জুড়ি গান: গিন্নীর ভাই পালিয়ে গেছে 
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: রঙ্গ-ব্যঙ্গ। সামাজিক চালচিত্র

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।