দিন গেল মোর মায়ায় ভুলে মাটির পৃথিবীতে (din gelo mor mayae bhule matir prithibite)
দিন গেল মোর মায়ায় ভুলে মাটির পৃথিবীতে।
কে জানে কখন নিয়ে যাবে গোরে মাটি দিতে রে॥
পাঁচ ভূতে আর চোরে মিলে
রোজগার মোর কেড়ে নিলে;
এখন কেউ নাই রে পারে যাবার দুটো কড়ি দিতে রে॥
রাত্রি শুয়ে আবার যে ভাই উঠ্ব সকাল বেলা,
বলতে কি কেউ পারি তবু খেলি মোহের খেলা।
বাদ্শা আমির ফকির কত
এলো আবার হলো গত রে;
দেখেও বারেক আল্লার নাম জাগে নাকো চিতে।
এবার বসবি কবে ও ভোলা মন আল্লার তস্বিতে রে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটি মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, পার্থিব মোহের অসারতা এবং আল্লাহর স্মরণে জীবনকে অর্থবহ করে তোলার এক গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান। কবি মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, মৃত্যু অনিবার্য; তাই মায়ার খেলায় বিভোর না থেকে স্রষ্টার স্মরণে আত্মনিবেদিত হওয়াই জীবনের প্রকৃত কল্যাণের পথ। ভোগ-বিলাস, সম্পদলিপ্সা ও জাগতিক আসক্তির বিপরীতে তিনি মৃত্যুর চিরন্তন সত্য ও পরকালের বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মানুষকে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং ঈশ্বরস্মরণের পথে ফিরে আসার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
গানের স্থায়ীতে কবি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন যে, তাঁর জীবন মায়াময় পৃথিবীর মোহে বিভ্রান্ত হয়ে কেটে গেছে। মানুষ জাগতিক সুখ, সম্পদ ও নানা আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বিস্মৃত হয়। অথচ কেউ জানে না, কখন মৃত্যুর আহ্বান এসে তাকে মাটির কবরে শায়িত করবে। এখানে ‘মাটি দিতে’ কথাটি মানুষের দেহের মাটিতে বিলীন হয়ে যাওয়ার অনিবার্য সত্যের প্রতীক।
অন্তরায় কবি মানুষের দেহ ও সম্পদের নশ্বরতার কথা স্মরণ করিয়েছেন। ‘পাঁচ ভূতে’ বলতে মানুষের দেহকে গঠিত পঞ্চভূতকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘চোরে’ বলতে সময়, রোগ, বার্ধক্য ও মৃত্যুর মতো শক্তিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের শক্তি, যৌবন ও অর্জিত সম্পদ কেড়ে নেয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ উপলব্ধি করে যে, তার সঙ্গে কোনো ধন-সম্পদ বা পার্থিব অর্জন যাবে না। এমনকি পরপারে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ‘দুটি কড়ি’ও তার নিজের কাছে থাকে না। এই চিত্রকল্প মানুষের অসহায়তা ও জাগতিক সম্পদের অসারতাকে প্রকাশ করেছে।
গানটির সঞ্চারী ও আভোগে কবি জীবনের অনিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর সকালে জেগে ওঠা যাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা মানুষের নেই। তবুও মানুষ মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়ে মোহের খেলায় মগ্ন থাকে। এখানে ‘মোহের খেলা’ বলতে সংসার, সম্পদ, ভোগবিলাস ও অহংকারের প্রতি অন্ধ আসক্তিকে বোঝানো হয়েছে। গানের শেষাংশে কবি এক চিরন্তন সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পৃথিবীতে অসংখ্য বাদশাহ, আমির ও ফকির এসেছেন, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছেন। ক্ষমতা, ধনসম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদা কাউকেই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। এত উদাহরণ চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মানুষের অন্তরে আল্লাহর স্মরণ জাগে না। তাই কবি নিজের মনকে সম্বোধন করে প্রশ্ন করেছেন—কবে সে আল্লাহর তসবিহে বসবে এবং তাঁর স্মরণে আত্মনিয়োগ করবে? এখানে ‘আল্লার তসবিহ’ কেবল জপ বা নামস্মরণ নয়; বরং আল্লাহভীতি, আত্মশুদ্ধি, সৎজীবন ও পরকালের প্রস্তুতির প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ ১৪১৭, ফেব্রুয়ারি ২০১১)। ৫৯১ সংখ্যক গান]
- রেকর্ড: টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৪০ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭)। এফটি ১৩৪৩৪। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ। সুর: নজরুল ইসলাম] [শ্রবণ নমুনা]
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- সুধীন দাশ ও সেলিনা হোসেন। নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (৩৭শ খণ্ড)। দ্বিতীয় মুদ্রণ [নজরুল ইন্সটিটিউট। পৌষ, ১৪২১ বঙ্গাব্দ/ জানুয়ারি, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ]। ৯ম গান। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধরধ্মসঙ্গীত। ইসলামী গান। সুফিবাদ। আত্মদর্শন
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্টের সুর
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: গা