বল্ রে জবা বল্ (bol re joba bol)
বল্ রে জবা বল্ —
কোন্ সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল॥
মায়া-তরুর বাঁধন টু'টে মায়ের পায়ে পড়লি লু'টে
মুক্তি পেলি, উঠলি ফুটে আনন্দ-বিহ্বল।
তোর সাধনা আমায় শেখা (জবা) জীবন হোক সফল॥
কোটি গন্ধ-কুসুম ফোটে, বনে মনোলোভা -
কেমনে মা'র চরণ পেলি, তুই তামসী জবা।
তোর মত মা'র পায়ে রাতুল হবো কবে প্রসাদী ফুল,
কবে উঠবে রেঙে
ওরে মায়ের পায়ের ছোঁয়া লেগে উঠবে রেঙে,
কবে তোরই মত রাঙবে রে মোর মলিন চিত্তদল॥
- ভাবসন্ধান: গানটিতে কবি জবা ফুলকে শ্যামা মায়ের চরণপ্রাপ্ত এক সাধক-সত্তার প্রতীক হিসেবে কল্পনা করেছেন। জবা ফুল এখানে কেবল একটি ফুল নয়; এটি ভক্তের প্রতীক। মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শ্যামার চরণে পৌঁছানো এবং তাঁর স্পর্শে কলুষিত হৃদয়ের পবিত্র ও প্রেমময় হয়ে ওঠাই গানটির মূল ভাব। বহু সাধনার কল্যণে শ্যামের চরণ স্পর্শ করা সৌভাগ্য লাভ করা যায়। তাই জবার কাছে কবির প্রশ্ন - কোন সাধনার ফলে সে মায়ের পায়ের কাছে সে স্থান লাভ করার সৌভাগ্য লাভ করেছে। কবির শ্যামার প্রতি ভক্তির কল্পবিহারে জবার কাছে তাঁর জিজ্ঞাসা- কিভাবে মায়ের পায়ের স্পর্শ পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করা যায়, তাঁরই গোপন রহস্য-কথা। এই ভাবাদর্শে অনুসরণে জবাকে একে একে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছেন।
'মায়া-তরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে'- এখানে জগতের মায়া ও আসক্তির বন্ধন ছিন্ন করে শ্যামার চরণে আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে। সেই আত্মসমর্পণের ফলেই জবা যেন মুক্তি পেয়েছে, প্রস্ফুটিত হয়েছে এবং আনন্দে অভিভূত হয়েছে। কবিও তাই জবার কাছে সেই সাধনার শিক্ষা চাইছেন, যাতে তাঁর নিজের জীবনও সার্থক হয়।
গানটির পরের অংশে কবি প্রকৃতির অসংখ্য সুগন্ধি ও মনোহর ফুলের সঙ্গে জবার তুলনা করেছেন। এত সুন্দর ও সুগন্ধি ফুল থাকতে 'তামসী জবা' কীভাবে মায়ের চরণ লাভ করল—এই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এখানে জবার বিশেষত্ব তার সৌন্দর্য বা সুগন্ধে নয়; বরং মায়ের চরণে নিবেদিত হওয়ার যোগ্যতায়।
গানের শেষাংশে কবির গভীর আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। কবি মনে করেন, শ্যমার রাঙা পায়ের স্পর্শে জবা হয়ে উঠেছে রাতুল তথা রক্ততুল্য জবা। এই কারণেই তাঁর নাম রক্তজবা। তিনি চান, জবার মতো তাঁর হৃদয়ও একদিন মায়ের পায়ের স্পর্শে রাঙা হয়ে উঠুক। এখাবদে জবার রক্তবর্ণ এখানে ভক্তি, আত্মসমর্পণ ও শ্যামার প্রেমের প্রতীক। যাঁর স্পর্শে তাঁর 'মলিন চিত্তদল' তথা 'কবির পাপ, অজ্ঞতা, আসক্তি ও আধ্যাত্মিক কলুষে আচ্ছন্ন হৃদয়'- হয়ে উঠবে রক্তজবার মতো পবিত্র এবং মায়ের স্পর্শ পাওয়ার যোগ্য।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২) মাসে, এইচএমভি গানটির রেকর্ড করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৪ মাস।
এই গানটি রচনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা যায়- আসাদুল হকের রচিত 'নজরুলের শ্রুতিধর ধীরেন দাস' গ্রন্থে। লেখক ধীরেন দাসের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র হিমাদ্রী দাসের উদ্ধৃতিতে লিখেছেন-
'...তাঁদের বাবা, ধীরেন দাস [ধীরেন্দ্রনাথ দাস] একদিন অনুপ কুমারকে কথায় কথায় বলেছিলেন, একদিন বিশেষ কোন কাজে খুব সকালে গিয়েছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানীর রিহার্সেল অফিসে । তখন কাজী তাঁর কোন জরুরী কাজের জন্য ওখানে ছিলেন। প্রতিদিনের মতো সকাল বেলা উড়িয়া ঠাকুর (পুরোহিত) এসেছে পূজা করতে পুরোহিতের ডালিতে ছিল নানা রকমের ফুল। বিভিন্ন দেবতাকে বিভিন্ন ফুলের পুজা করছেন। কাজীদা আপন মনে পুরোহিতের এই পূজা পর্ব প্রত্যক্ষ করছেন। সব পুজার শেষে পুরোহিতের হাতের ডালিতে পড়ে আছে মাত্র একটি রক্তজবা ফুল। এই ফুলটি পুরোহিত মা কালীর পায়ে দিয়ে পূজা পর্ব শেষ করে চলে গেল। হঠাৎ কাজীদা আমাকে জিজ্ঞনা করলেন, আচ্ছা ধীরু (নজরুল বাবাকে এই নামেই ডাকতেন) সব দেবতাই যে কোন ফুলেই তুষ্ট, তবে কালী ঠাকরুণ কেন শুধুই জবা ফুলে তুষ্ট হন। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই কাজীদা হন হন করে উঠে গেলেন ওপরে তার নিজের কামরায় । আমি অবাক হয়ে কিছু সময় তার এই চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, কাজীদা হঠাৎ এমন করে চলে গেলেন কেন? তারপর আমি আমার প্রয়োজনীয় কাজগুলো প্রায় শেষ করেছি এমন সময় দেখলাম কাজীদা ওপর থেকে নিচে নেমে এলেন সোজা আমার রুমে, আমার সামনে দীড়িয়ে বললেন, 'ধীরু, লিখে ফেলেছি।' কাজীদার হাত থেকে কাগজটি নিয়ে দেখলাম একটি অপূর্ব গান (শ্যামা সঙ্গীত)। গানের বাণী নিম্নরূপ: 'শ্যামা সঙ্গীত/দেশ মিশ্র দাদরা/ বল জবা বল...'
['নজরুলের শ্রুতিধর ধীরেন দাস'। আসাদুল হক। হাতে খড়ি/ঢাকা। জানুয়ারি ২০০৪। পৃষ্ঠা: ৫৫।
- গ্রন্থ:
- রাঙা জবা। কাজী নজরুল ইসলাম। প্রথম সংস্করণ। হরফ প্রকাশনী, কলিকাতা [১৪ এপ্রিল ১৯৬৬)। ১লা বৈশাখ ১৩৭৩] গান সংখ্যা ১। পৃষ্ঠা: ৯।
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৬৪২]
- নজরুল-রচনাবলী জন্মশতবর্ষ-সংস্করণ। [বাংলা একাডেমী ঢাকা। কার্তিক ১৪১৯/নভেম্বর ২০১২ ] গান সংখ্যা ১। পৃষ্ঠা ২১৭।
- নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, সাতাশ খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা।[কার্তিক, ১৪১২/অক্টোবর ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] ২১ সংখ্যক গান। [নমুনা]
- রেকর্ড: এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৫ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২)। এন ৭৪২১। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ] [শ্রবণ নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- আহসান মুর্শেদ। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের [শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ] সুরানুসারে স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপ নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, সাতাশ খণ্ড- এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
[নমুনা]
- আহসান মুর্শেদ। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের [শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ] সুরানুসারে স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপ নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, সাতাশ খণ্ড- এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ভক্তি [হিন্দুধর্ম, শাক্ত, বন্দনা (পরোক্ষ)]
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল: দাদরা
- গ্রহস্বর: মা