তব বাঁশরি কি হরি শুনিতে পাব না (tobo bashori ki hori shunite pabo na)

তব বাঁশরি কি হরি শুনিতে পাব না পাশরিয়া আছি বরে।
তব রাস উৎসবে ভিখারির মত বসে আছি পথ তলে॥
            যে ডাকে, যদি তারি হও একা
            ডাকে না যে, সে কি পাইবে না দেখা,
কাঁদে না যে ছেলে জননী কি তারে ডাকিয়া লয় না কোলে॥
(হরি!) পথ ভুলিয়া যে ঘোরে অরণ্যে দেখাবে না তারে পথ
(তুমি) সেদিনো ফিরায়ে দাওনি কংস দুর্যোধনের রথ।
            হরি! তুমি যদি নাহি ডাক আগে
            তাহার কি কভু হরি-প্রেম জাগে?
না শুনিয়া বাঁশি ব্রজবাসিনীরা যেত কি যমুনার জলে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানটিতে হরি এবং তাঁর অবতার কৃ্ষ্ণের প্রতি এক অপাঙ্‌ক্তেয় ভক্তের আকুল আর্তি উপস্থাপিত হয়েছে। এই ভক্ত কৃষ্ণের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য না পেয়েও দূর থেকে তাঁর প্রতি ভক্তি-অর্ঘ নিবেদন করেন, যা তাঁর পরম আত্মনিবেদনের বহিঃপ্রকাশ। এই গানটি মূলত সংশয়বাদী অথচ প্রেমপিপাসু হৃদয়ের আর্তনাদ। এ গানে ঈশ্বর কে কোনো বিচারক বা কঠোর শাসক হিসেবে নয়, বরং একজন করুণাময় প্রেমময় পুরুষ হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। মানুষ নিজের চেষ্টায় সব সময় স্রষ্টাকে খুঁজে পায় না; তাই কবি বিশ্বাস করেন, স্রষ্টাই যদি আগে থেকে পথ না দেখান বা বাঁশির সুরে ডেকে না নেন, তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই প্রেমময় ঈশ্বরকে পাওয়া অসম্ভব। এটি স্রষ্টার কৃপার ওপর মানুষের চূড়ান্ত নির্ভরতার গান। এই ভাবনাকেই কবি নানা উপমা ও রূপকতার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন এই গানে।

    ভক্ত দূরে আছেন বলেই কি তিনি কৃষ্ণের প্রেমমধুর বংশিধ্বনি শুনতে পাবেন না? ভক্তের মনে যে কৃষ্ণ-ভক্তি রয়েছে, তারই মোহে এই ধ্বনি তিনি শোনে ভক্তির শ্রবণেন্দ্রিয়ে। তাই ভক্ত তাঁর সেই অন্তহীন প্রেমমোহে রাস-উৎসব দেখার আশায় ভিখারির মতো বসে থাকেন ভক্তি মার্গে। আত্মজিজ্ঞাসায় কৃষ্ণ ের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন-  যিনি তাঁকে ডাকেন তিনি ই কি শুধু তার ডাকে সাড়া দেন। সাধক তুলনীয় বাক্যে কৃষ্ণকে স্মরণ করিয়ে দেন- সে শিশু কাঁদে না, তাকে কি জননী কোলে তুলে নেন না। যৌক্তিক দাবিতে সাধক হরির কাছে জানতে চান- ' জগৎপালক হরিকে না ডাকলে, ভক্তকেই বা কেন তিনি কাছে টেনে নেবেন না ' ।

    সাধক কবি হরিকে বলেন- পথহারা যে পথিক পথ ভুলে জ্ঞানহীন, দিশাহীন হয়ে সংসার অরণ্যে ঘুরে মরে, তাকে তিনি পথ দেখাব েন না। কংস, দুর্যোধনের দুরাচার নৃপতি হলেও, তিনি তাঁদের রথকে ফিরিয়ে দেন নি। তবে সাধককেই কেন তিনি ফিরাবেন। সাধক হরিকে সকাতরে বলেন- তিনি যদি আগে আহ্বান না করেন, তাহলে তাঁর মনে কে হরি-প্রেম জাগ্রত হবে। কৃষ্ণের বাঁশী বাজতো বলেই ব্রজবাসিনীরা যমুনায় যেতো জল আনতে।  এতো কৃষ্ণের আহ্বানে কৃষ্ণের ভক্তের সাড়া দেওয়া।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭) মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির প্রথম রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৩ মাস।
     
  • রেকর্ড: মেগাফোন ১৯৪০ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭)। জেএনজি ৫৪৯৮। কমল গঙ্গোপাধ্যায়
     
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্‌ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ১৯০৭। পৃষ্ঠা ৫৭৫]
  • স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
  • সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন ধর্ম, বৈষ্ণব । কৃষ্ণ। অনুযোগ
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের সুর
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।