তোমারি আশায় তেয়াগিনু সব
তোমারি আশায় তেয়াগিনু সব সুখ আর মোরে রাখিও না দূরে
তোমার আনন্দ-ব্রজে হে নন্দ-দুলাল রাখিও সাথি ক'রে॥
যে গোঠে চরাও ধেনু কিশোর রাখাল
(সেথা) রাখাল বালক যেন হই চিরকাল,
যে ফুলের গেঁথে মালা পরায়ে ব্রজের বালা
(যেন) লুকায়ে থাকি সেই ফুলের ডোরে॥
যে যমুনার-জলে যে কদম-তলে তুমি বিহর, প্রিয়
যেথা রাধার সনে রহ নিরজনে সেথা মোরে ডাকিও।
লাখো জনম ল'য়ে লাখো যুগ আসিব
(তব) নিত্য-রাসলীলা রসে ভাসিব
মোক্ষ মুক্তি আমি চাহি না জীবন-স্বামী
হেরিব তোমারে শুধু নয়ন ভ'রে॥
বিরহ বেদনা মোর জ্বলে হৃদিকন্দরে
মুছাইয়া দাও আঁখিলোর।
তব চিত্তে মিলায় আজি চিত্ত হে মম
অঙ্গে মিলাও তব অঙ্গ পীতম।
জনমে জনমে মীরা তোমারি দাসী
হৃদি-বৃন্দাবনে নিতি ঝুরে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এক অনন্য ভক্তের চরম আত্মনিবেদন, প্রেমময় ভক্তি এবং নিত্যসান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে ভক্ত পার্থিব সুখ, ভোগ-বিলাস, এমনকি মোক্ষ-মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও ত্যাগ করে কেবল শ্রীকৃষ্ণের সান্নিধ্য ও দর্শনকেই জীবনের একমাত্র কাম্য বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখ্য, গানটি মীরার ভজন 'তুমারি কারণ সব সুখ'-এর অনুবাদ। তাই এই গানের ভক্তসত্তা মূলত মীরাবাঈয়ের প্রেমময় কৃষ্ণভক্তির আদর্শে উদ্বুদ্ধ, যেখানে কৃষ্ণপ্রেমই জীবনের পরম লক্ষ্য।
গানের সূচনায় ভক্ত জানান যে, তিনি শ্রীকৃষ্ণের আশায় জাগতিক সকল সুখ ত্যাগ করেছেন। তাই তাঁর প্রার্থনা—কৃষ্ণ যেন তাঁকে নিজের আনন্দময় ব্রজধাম থেকে দূরে না রাখেন। তিনি চান, নন্দদুলাল কৃষ্ণের সঙ্গী হয়ে চিরকাল ব্রজে অবস্থান করতে। এখানে ব্রজ কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি কৃষ্ণপ্রেম, আনন্দ ও কৃষ্ণসান্নিধ্যের প্রতীক।
পরবর্তী অংশে ভক্তের আত্মবিসর্জনের আকাঙ্ক্ষা আরও গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি চান, কৃষ্ণ যেখানে গোপবালকদের সঙ্গে ধেনু চরান, সেখানে একজন সাধারণ রাখালবালক হয়ে থাকতে। আবার ব্রজবালারা যে ফুল দিয়ে কৃষ্ণের মালা গাঁথে, সেই ফুলমালার ডোরে লুকিয়ে থাকতেও তাঁর আপত্তি নেই। অর্থাৎ, কৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভের জন্য তিনি যেকোনো ক্ষুদ্রতম রূপ ধারণ করতেও প্রস্তুত। তাঁর কাছে মর্যাদা বা পরিচয়ের চেয়ে কৃষ্ণের নৈকট্যই অধিক মূল্যবান।
এরপর ভক্ত যমুনাতীর, কদমতল এবং রাধা-কৃষ্ণের নির্জন মিলনস্থলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কৃষ্ণকে অনুরোধ করেন, সেইসব লীলাক্ষেত্রেও যেন তাঁকে স্থান দেওয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, লক্ষ জন্ম ও লক্ষ যুগ ধরে জন্মগ্রহণ করেও যদি কৃষ্ণের নিত্য রাসলীলার রসে নিমগ্ন থাকা যায়, তবে তাতেই তাঁর জীবন সার্থক। এই কারণেই তিনি মোক্ষ বা মুক্তি কামনা করেন না। কারণ মুক্তি তাঁকে কৃষ্ণলীলা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে, অথচ তাঁর কামনা কেবল কৃষ্ণদর্শন ও কৃষ্ণসঙ্গ।গানের শেষাংশে ভক্তের বিরহবেদনা তীব্র হয়ে ওঠে। কৃষ্ণ-বিচ্ছেদের আগুন তাঁর হৃদয়ের গভীরে জ্বলছে। তাই তিনি কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তিনি তাঁর অশ্রু মুছে দেন এবং নিজের চিত্তের সঙ্গে ভক্তের চিত্তকে এক করে নেন। “অঙ্গে মিলাও তব অঙ্গ পীতম”—এই পঙ্ক্তিতে আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার পূর্ণ মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এটি কেবল শারীরিক মিলনের রূপক নয়, বরং ভক্তসত্তার সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণসত্তায় বিলীন হয়ে যাওয়ার বাসনা।
শেষে ভক্ত নিজের পরিচয় দিয়েছেন জন্মজন্মান্তরের দাসী মীরা। মীরা বিশ্বাস করেন তাঁর হৃদয়ই বৃন্দাবন, আর সেই হৃদি-বৃন্দাবনে তিনি নিত্য কৃষ্ণবিরহে কাতর হয়ে থাকেন। এই বিরহই তাঁর প্রেমের গভীরতার প্রমাণ এবং কৃষ্ণপ্রেমের চিরন্তন সাধনার প্রতীক হয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। - রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯৩০ গান। পৃষ্ঠা: ৫৮১।
- বাণী প্রকৃতি: গানটি মীরার ভজন 'তুমারি কারণ সব সুখ'-এর অনুবাদ।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। মীরার আত্মনিবেদন