নওল কিশোর শ্যামল এলো
নওল কিশোর শ্যামল এলো মধু-জ্যোৎস্না নাহিয়া।
নবনী-গলানো লাবনি ঝরে রস-বিগ্রহ বাহিয়া॥
বনে উপবনে কুসুম ছড়ায়ে
নীরদ-কণ্ঠে বিজলি জড়ায়ে
বেণু বাজায়ে ধেনু চরায়ে 'রাধা রাধা' গান গাহিয়া॥
আমার হৃদয়-ব্রজধামে একি রাস-উৎসব, সজনী,
নিশিদিন আমি শুধু চাঁদ হেরি, পোহায় না মোর রজনী।
তারে কালো ব'লে কে করে উপহাস
আনে যে এমন আনন্দ রস,
যত দেখি তত বাড়ে যে তিয়াস (ঐ) ঘনশ্যাম পানে চাহিয়া॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণ-এর অপরূপ রূপমাধুর্য, প্রেমময় লীলা এবং ভক্তহৃদয়ে তাঁর আনন্দময় উপস্থিতির চিত্ররূপ মহিমা উপস্থাপিত হয়েছে।
গানটির স্থায়ীতে কবি কৃষ্ণকে ‘নওল কিশোর শ্যামল’ অর্থাৎ চিরনবীন, শ্যামবর্ণ কিশোর রূপে কল্পনা করেছেন। যিনি মধুর জ্যোৎস্নায় স্নাত হয়ে প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। কৃষ্ণের কোমল, স্নিগ্ধ ও আকর্ষণীয় রূপের বর্ণনা বলা হয়েছে- তাঁর দেহসৌন্দর্য গলিত মাখনের মতো কোমল ও মাধুর্যে পূর্ণ। তিনি নিজেই যেন প্রেম, সৌন্দর্য ও আনন্দের জীবন্ত মূর্তি হয়ে বিরাজ করেন।
গানটির অন্তরাতে তাঁর রূপমাধুর্যের বর্ণনায় বলেছেন- কৃষ্ণের আগমনে বন-উপবন ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়ে ওঠে। তাঁর কণ্ঠে মেঘের মতো গম্ভীর সুরে বিদ্যুতের মতো উজ্জ্বল দ্যুতি ছড়ায়। আর তিনি বাঁশি বাজিয়ে ধেনু চরান এবং বাঁশির সুরে প্রেমের আহ্বান জানিয়ে 'রাধা রাধা' নামগান করেন।
সঞ্চারীতে কবি তাঁর ভক্তহৃদয়ের অন্তর্জগতকে বৃন্দাবনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কবির হৃদয়-ব্রজধামে কৃষ্ণের আগমনে যেন এক অনন্ত রাসোৎসবের সৃষ্টি হয়। কৃষ্ণের রূপ ও প্রেমের আলোয় ভক্তের জীবন আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি কল্পলোকে নিশিদিন শুধু চন্দ্ররূপী কৃষ্ণকে দেখেন। তবু তাঁর মনোলোকে আধার রাত্রি ফুরায় না।
আভোগে বলা হয়েছে- লোকে কৃষ্ণের কালো রূপ নিয়ে উপহাস করে। কবি জানেন তাঁর কালো রূপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অপরিসীম আনন্দ ও প্রেমের রস। এই শ্যামবর্ণ কোনো অন্ধকার নয়, বরং তা আকর্ষণ, গভীরতা ও মাধুর্যের প্রতীক। তাকে যতই দেখা যায়, ততই প্রেমের পিপাসা বাড়ে। অর্থাৎ ভক্তের হৃদয়ে কৃষ্ণের প্রতি প্রেম ও আকুলতা কখনো পূর্ণ হয় না; বরং তাঁর সান্নিধ্যের পিপাসা ক্রমশ বাড়তে থাকে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯৫৫। পৃষ্ঠা: ৫৮৮]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। শ্রীকৃষ্ণ। বন্দনা