নব নীরদ ঘনশ্যাম হে

নব নীরদ ঘনশ্যাম হে!
মোর চোখের চাতক রূপের তৃষ্ণায় ঝুরে মরে অবিরাম হে!
মোর মনের মাধবী শুকাইয়া যায় না হেরি কৃষ্ণ মেঘে,
মোর রাতের স্বপন দিবসে মিলায় প্রেম রহে একা জেগে।
ফেলে ফুল-মালা করি জপমালা প্রিয় নাম হে!
যবে আমার মনের মাধবী-বিতানে আসিবে হে নবমালী,
যদি ফুল নাহি থাকে ফুলের মতন আপনারে দিব ডালি।
মোর তনু হবে তব পূজার কুসুম মোর প্রাণ হবে ব্রজধাম হে!

  • ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্তহৃদয়ের গভীর প্রেম, বিরহ ও শ্রীকৃষ্ণের দর্শনের জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। কবি শ্রীকৃষ্ণকে নব নীরদ ঘনশ্যাম অর্থাৎ নববর্ষার কালো মেঘের মতো মনোহর শ্যামবর্ণ রূপে কল্পনা করেছেন। তাঁর অপরূপ রূপ দর্শনের তৃষ্ণায় ভক্তের চোখ যেন চাতক পাখির মতো ব্যাকুল হয়ে আছে; যেমন চাতক পাখি একমাত্র স্বাতী নক্ষত্রের বৃষ্টিধারার অপেক্ষায় থাকে, তেমনি ভক্তের নয়ন কেবল কৃষ্ণদর্শনের আশায় দিনরাত প্রতীক্ষা করে।

    কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে ভক্তের হৃদয় মাধবী লতার মতো শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণরূপী মেঘের স্নিগ্ধ দর্শন ও সান্নিধ্য ছাড়া তার প্রেমের উদ্যান প্রাণহীন হয়ে পড়ে। যে স্বপ্নে প্রিয়তমের মিলনের আশা ছিল, তা জাগ্রত জীবনে পূর্ণ হয় না; ফলে প্রেমের আকাঙ্ক্ষা একাকী হৃদয়ে জেগে থাকে।

    প্রিয় কৃষ্ণের বিরহে ভক্ত বাহ্যিক সাজসজ্জা ও ফুলের মালা ত্যাগ করে তাঁর নামস্মরণকেই জীবনের একমাত্র আশ্রয় করে নিয়েছে। যে হাতে ফুলের মালা থাকার কথা, সেই হাতে এখন প্রিয় নামের জপমালা শোভা পাচ্ছে। এটি প্রেমের এমন এক অবস্থা, যেখানে বাহ্যিক উপাচারের চেয়ে নামস্মরণই হয়ে ওঠে ভক্তির প্রধান সাধনা।

    ভক্ত কামনা করে, যেদিন নবমালী শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মনের মাধবী-কুঞ্জে আগমন করবেন, সেদিন যদি নিবেদনের জন্য কোনো ফুল না-ও থাকে, তবুও সে নিজেকেই ফুলের মতো করে কৃষ্ণের চরণে অর্পণ করবে। তার দেহ হবে কৃষ্ণের পূজার কুসুম এবং তার প্রাণ হবে পবিত্র ব্রজধাম—যেখানে কৃষ্ণের প্রেমলীলা চিরদিন বিরাজ করবে।

  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 
  • গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্‌ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ১৯৬২। পৃষ্ঠা ৫৯০]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বিরহ।

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।