বিষ্ণুসহ ভৈরব
বিষ্ণুসহ ভৈরব
অপরূপ মধুর মিলন শম্ভু মাধব।
দক্ষিণে শঙ্কর শ্রীহরি বামে,
মিলিয়াছে যেন রে কানু বলরামে
দেখি এক সাথে যেন দেখি রে
স্বয়ম্ভু কেশব॥
বিমল চেতনা আনন্দ মদন
শিব-নারায়ণের যুগল মিলন,
এক সাথে ব্রজধাম শিবলোকে
অরূপ স্বরূপ নেহারি চোখে —
শোন্ রে একসাথে বেণূকার প্রণব॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি সনাতন হিন্দু ধর্মে পৌরাণিক দর্শনের সূত্রে- রাগ বিষ্ণুভৈরবের নান্দনিক দর্শনকে উপস্থাপন করেছেন। এ গানের শৈব ও বৈষ্ণব ভাবধারার ঐক্য এবং শিব ও বিষ্ণুর অভিন্ন রূপমাধুর্যের বিষ্ণুভৈরব রাগের ভাবগত আদর্শকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। এই রাগের মধ্যে তিনি উভয় দেবতাকে প্রত্যক্ষ করছেন।
কবির পৌরাণিক ভাবনায় শিব ও বিষ্ণুকে পৃথক দেবতা হিসেবে নয়, বরং একই পরম সত্যের দুই রূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। গানের সূচনায় কবি “বিষ্ণুসহ ভৈরব, অপরূপ মধুর মিলন শম্ভু মাধব” বলে শিব (ভৈরব, শম্ভু) ও বিষ্ণুকে (মাধব) একত্রে উপস্থিত করেছেন। এই যুগল রূপের দক্ষিণে শঙ্কর এবং বামে শ্রীহরিকে দেখে কবির মনে হয়েছে, যেন কৃষ্ণ ও বলরাম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, এই যুগল রূপ দর্শন করে তাঁর মনে হয় যেন তিনি একসঙ্গে স্বয়ম্ভূ শিব ও কেশব বিষ্ণুকে প্রত্যক্ষ করছেন। শিবের বৈরাগ্য, জ্ঞান ও চেতনার সঙ্গে বিষ্ণুর সৌন্দর্য, প্রেম ও আনন্দ একাকার হয়ে এক অপূর্ব পূর্ণতা লাভ করেছে। তাই এই মিলন কেবল দুটি দেবমূর্তির নয়, বরং জ্ঞান ও প্রেম, ত্যাগ ও লীলা, সংযম ও করুণার মিলন। 'এক সাথে ব্রজধাম শিবলোকে'— এই পঙ্ক্তিতে কবি বৃন্দাবনের প্রেমময় লীলাক্ষেত্র এবং কৈলাসের তপস্যাময় শিবলোককে একই আধ্যাত্মিক সত্যের দুই প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর উপলব্ধিতে এই দুই জগতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; উভয়ই পরমেশ্বরেরই ভিন্ন ভিন্ন লীলা।
গানের শেষ পঙ্ক্তি—'শোন্ রে একসাথে বেণূকার প্রণব'—অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে বেণূ কৃষ্ণের প্রেম, আনন্দ ও ভক্তির প্রতীক, আর প্রণব (ওঁ) শিব ও বৈদিক ব্রহ্মতত্ত্বের প্রতীক। কবি অনুভব করেন, কৃষ্ণের বাঁশির সুর এবং প্রণব ‘ওঁ’-এর ধ্বনি শেষ পর্যন্ত একই পরম সত্যের আহ্বান। অর্থাৎ প্রেম, জ্ঞান, ভক্তি ও ব্রহ্মচেতনা—সবই একই ঈশ্বরসত্যের বিভিন্ন প্রকাশ। অতএব, এই গানে নজরুল শিব ও বিষ্ণুর অভিন্নতা, শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মমতের সমন্বয় এবং সর্বধর্মের ঐক্যের বাণী গভীর কাব্যিক সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে শম্ভু ও মাধব, কৈলাস ও বৃন্দাবন, প্রণব ও বাঁশির সুর—সবই এক পরম চৈতন্য তথা প্রণবে বিচিত্র প্রকাশ। এখানে বেনুকা- কৃষ্ণ, প্রেম, ভক্তি, লীলা, বৈষ্ণবভাব আর প্রণব (ওঁ) ব্রহ্ম, যোগ, ধ্যান, শিবতত্ত্ব, বৈদিক চেতনা।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ১৫৮৭ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৪৭৫।
- সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি (চতুর্থ খণ্ড)। স্বরলিপিকার- কাজী অনিরুদ্ধ। সাহিত্যম। ১৯৭৮। গান সংখ্যা চুরাশী। পৃষ্ঠা ১৭৪-১৭৫। নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। যুগলরূপ। বিষ্ণু-ভৈরব (শিবের)। রূপকার্থে রাগ রূপগত বিশ্লেষণ
- সুরাঙ্গ: খেয়ালাঙ্গ
- রাগ: বিষ্ণু-ভৈরব
- রাগ পরিচয়: আরোহণ: স ঋ ম প দ ণ র্স
অবরোহণ: র্স ণ দ প ম গ ঋ স
জাতি: ষাড়ব সম্পূর্ণ
- রাগ পরিচয়: আরোহণ: স ঋ ম প দ ণ র্স
- তাল: ত্রিতাল
- গ্রহস্বর: ম
- রাগ: বিষ্ণু-ভৈরব