তোর জননীরে কাঁদাতে কি মেয়ে হয়ে এসেছিলি (tor jononire kandate ki meye hoye eshechhili)

তোর জননীরে কাঁদাতে কি মেয়ে হয়ে এসেছিলি।
তুই কোন শিবলোক করলি আলো, উমা মাকে শুধু দুঃখ দিলি॥
তোর সেই খেলনা আচে পড়ে, তুই শুধু নেই খেলা ঘরে,
তোর সেই খেলনা বুকে ধরে কাঁদব কত নিরিবিলি॥
শুনেছি মা, পূজায় যযাহার মেয়ে নাহি ফেরে ঘরে
তুই নাকি তার শূন্য বুকে আসিস মেয়ের মূর্তি ধরে।
মা কোথায় আছিস সে কোন রূপে
সেই রূপে আয় চুপে চুপে,
কোন মাকে তোর শান্তি দিয়ে, আপন মাকে কাঁদাইলি॥

  • ভাবসন্ধান:  শচীন সেনগুপ্তের রচিত হরপার্বতী নাটকে 'মায়ার গীত' হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই গানটিতে কন্যাহারা জননীর হৃদয়ের গভীর শোক, আকুলতা এবং মাতৃস্নেহের বেদনাময় উপস্থাপিত হয়েছে। গীতিকার দেবী উমার কাহিনিকে অবলম্বন করে এমন এক মায়ের মনের কথা তুলে ধরেছেন, যিনি তাঁর প্রিয় কন্যাকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান। এখানে উমা একাধারে দেবী এবং সকল কন্যাসন্তানের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

    মা স্নেহভরে কন্যাকে প্রশ্ন করেন—সে কি কন্যা হিসেবে পৃথিবীতে এসেছিল শুধু তাঁর হৃদয় ভেঙে দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য? সে তার মাকে দুখের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে- শিবলোককে আলোকিত করে রাখে? কন্যার বিদায়ের পর তার শূন্য ঘর, ছড়িয়ে থাকা খেলনা এবং স্মৃতিচিহ্নগুলো মায়ের বেদনা আরও তীব্র করে তোলে। সেই খেলনাগুলো বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি নির্জনে অশ্রু বিসর্জন করেন এবং হারিয়ে যাওয়া কন্যার স্মৃতিতে ডুবে থাকেন।

    সনাতন হিন্দু ধর্মাবল্মবীদের মধ্য এই বিশবাস প্রচলিত আছে যে, যেসব মায়ের কন্যা পূজার সময়ে ঘরে ফিরে আসে না, দেবী উমা নাকি তাঁদের শূন্য হৃদয়ে কন্যারূপে আবির্ভূত হয়ে সান্ত্বনা দেন। এই বিশ্বাস থেকেই শোকাহত মা আশা করেন, তাঁর কন্যাও কোনো না কোনো রূপে ফিরে আসবে। তাই তিনি আকুলভাবে ডাক দেন—যে রূপেই থাকুক না কেন, যেন নিঃশব্দে তাঁর কাছে ফিরে আসে এবং তাঁর শূন্য বুক ভরে দেয়।

    গানের শেষাংশে মায়ের অভিমান আরও গভীর হয়ে ওঠে। তিনি প্রশ্ন করেন, যে কন্যা অন্য মায়েদের দুঃখ দূর করে শান্তি দিতে পারে, সে কেন নিজের মাকে অশ্রুসিক্ত করে রেখে গেল? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মাতৃস্নেহের গভীরতা, বিচ্ছেদের অসহনীয় যন্ত্রণা এবং সন্তানকে ফিরে পাওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা হৃদয়স্পর্শীভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে (১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ) হরপার্বতী, শচীন সেনগুপ্তের রচিত নাটকের গ্রন্থের প্রকাশিত হয়েছিল। এই গ্রন্থে এই গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। গ্রন্থটির প্রকাশকাল ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ উল্লেখ থাকলেও মাসের নাম উল্লেখ নেই। আবার পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক লাইব্রেরির তালিকায় গ্রন্থভুক্তির সময় উল্লেখ আছে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ।  এই বিচারে প্রকাশকালের সময় ধরা যেতে পারে- বৈশাখ- চৈত্র ১৩৩৯ (এপ্রিল- ডিসেম্বর১৯৩২)। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩২ বৎসর।
     
  • গ্রন্থ:
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯৩৩। পৃষ্ঠা: ৫৮২]
    • হরপার্বতী। শচীন সেনগুপ্তের রচিত নাটক [গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়। এন্ড সন্স। ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ। দ্বিতীয় অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্য। মায়ার গীত। পৃষ্ঠা: ৪১।
  • মঞ্চনাটক: হরপার্বতী। (শচীন সেনগুপ্তের রচিত নাটক)। মঞ্চস্থ (প্রথম): মিনার্ভা থিয়েটার কলকাতা। ২৪ আগষ্ট ১৯৪০ (শনিবার ৮ ভাদ্র ১৩৪৭)।
     
  • বেতার: হরপার্বতী। (শচীন সেনগুপ্তের রচিত নাটক)। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ১৯৪১। ২২ কার্তিক ১৩৪৭। সান্ধ্য অনুষ্ঠান। ৬.৪০-৮.৩৯।
    • সূত্র: বেতার জগৎ। বেতার জগৎ-এর ১১ বর্ষ ২১  সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ১১২৩ ও ১১৬০
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। উমা। বিরহ [হরপার্বতী নাটকের গান]

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।