তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে (tora dekhe ja amina mayer kole)

          তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
          মধু পূর্ণিমারি সেথা চাঁদ দোলে
          যেন ঊষার কোলে রাঙা-রবি দোলে॥
          কূল মখ্‌লুকে আজি ধ্বনি ওঠে, কে এলো ঐ
          কলেমা শাহাদতের্ বাণী ঠোঁটে, কে এলো ঐ
          খোদার জ্যোতি পেশানিতে ফোটে, কে এলো ঐ
          আকাশ-গ্রহ-তারা পড়ে লুটে, কে এলো ঐ
          পড়ে দরুদ ফেরেশ্‌তা, বেহেশ্‌তে সব দুয়ার খোলে॥
          মানুষে মানুষের অধিকার দিল যে-জন
          'এক আল্লাহ্‌ ছাড়া প্রভু নাই' কহিল যে-জন,
          মানুষের লাগি' চির-দীন্‌ বেশ ধরিল যে-জন
          বাদশা ফকিরে এক শামিল করিল যে-জন
          এলো ধরায় ধরা দিতে সেই সে নবী
          ব্যথিত-মানবের ধ্যানের ছবি
          আজি মাতিল বিশ্ব-নিখিল্‌ মুক্তি-কলোরোলে॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মকে কেন্দ্র করে মানবমুক্তি, সাম্য, ন্যায় ও করুণার এক মহামুহূর্তের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কবি মহানবীর জন্মকে কেবল একটি শিশুর জন্ম হিসেবে দেখেননি; বরং মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর আবির্ভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে সত্য, ন্যায়, সাম্য ও মুক্তির আলোকধারা প্রবাহিত হয়েছে—এই উপলব্ধিই গানের মূল প্রতিপাদ্য।

    গানটির স্থায়ীতে কবি সকলকে আমিনা মায়ের কোলে শয়ান নবজাতককে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি রূপকার্থে সেই শিশুকে পূর্ণিমার চাঁদ এবং ঊষার কোলে উদিত রক্তিম সূর্যের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। রাত্রির অন্ধকার দূর করে যেমন মোহময় পূর্ণিমা, আর সত্যের মতো সমুজ্জ্বল তরুণ সূর্য দেখা দেয়  উষাকালে। তেমনি অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাসকে অপসারিত করে- শিশু নবী আবির্ভুত হয়েছিলেন পূর্ণিমা বা উষাকালের সূর্যের মতো।

    এরপর প্রথম অন্তরাতে তাঁর জন্মকে মহাজাগতিক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কবির উপলব্ধি- সমগ্র সৃষ্টি যেন আনন্দধ্বনিতে মুখরিত হয়ে জানতে চাইছে- কে এই মহামানব, যার ওষ্ঠে থাকবে কালিমা ও শাহাদাতের বাণী অর্থাৎ একত্ববাদের ঘোষণা।  কবির কল্পনায় তাঁর কপালে খোদার নূর উদ্ভাসিত হয়েছে এবং আকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র পর্যন্ত তাঁর আগমনে অভিবাদন জানাচ্ছে। ফেরেশতারা দরুদ পাঠ করছেন এবং জান্নাতের সকল দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেছে। এসব চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি মহানবীর জন্মের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য ও ঐশী গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন।

    এরপর দ্বিতীয় অন্তরাতে মহানবীর মানবতাবাদী আদর্শের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কবি স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনিই মানুষে মানুষে সমতা ও মর্যাদার শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য বা প্রভু নেই। এর ফলে মানুষে মানুষে কৃত্রিম ভেদাভেদ, বংশগৌরব ও ক্ষমতার অহংকারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি নিজে সাধারণ ও দীন মানুষের জীবনধারা গ্রহণ করেছিলেন এবং বাদশাহ ও ফকিরকে একই মানবিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

    কবির দৃষ্টিতে মহানবী ছিলেন ব্যথিত ও নিপীড়িত মানবতার জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন মানুষের দুঃখ মোচন, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তির পথ প্রদর্শনের জন্য। তাই তাঁর আবির্ভাবে সমগ্র বিশ্ব আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। 'মুক্তি-কলোরোল' শব্দবন্ধের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মহানবীর আগমন মানুষের আত্মিক, সামাজিক ও মানবিক মুক্তির এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছিল।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ অক্টোবর (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯), 'জুলফিকার' নামক গীতি-গ্রন্থে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৪ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • জুলফিকার
      • প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২ (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)। ১৮ সংখ্যক গান।
      • নজরুল রচনাবলী,  জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা।  জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭। জুলফিকার। ১৮ সংখ্যক গান।  পৃষ্ঠা: ৩০২-৩০৩।
    • নজরুল গীতি, অখণ্ড
      • প্রথম সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৬ আশ্বিন ১৩৮৫। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮]
      • দ্বিতীয় সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ১ শ্রাবণ ১৩৮৮। ১৭ জুলাই ১৯৮১]
      • তৃতীয় সংস্করণ [ব্রহ্মমোহন ঠাকুর সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৮ মাঘ ১৪১০। ২৩ জানুয়ারি ২০০৪। ইসলামী গান। ১০৮১ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ২৭৪]
      • পরিবর্ধিত সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। বৈশাখ শ্রাবণ ১৪১৩। এপ্রিল-মে ২০০৬] ১০৩৩ সংখ্যাক গান। পৃষ্ঠা: ১৯৩।
    • নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্‌ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ২১। পৃষ্ঠা ৭]
    • নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি প্রথম খণ্ড। স্বরলিপিকার: সুধীন দাশ। প্রথম প্রকাশ, তৃতীয় মুদ্রণ [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। অগ্রহায়ণ ১৪০২। নভেম্বর ১৯৯৫। ২১ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ১০৩-১০৭] [জেএনজি ৫৭]
  • রেকর্ড: মেগাফোন রেকর্ড [মে ১৯৩৩ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪০)। জেএনজি ৫৭। শিল্পী: আব্বাস উদ্দীন  [শ্রবন নমুনা]
     
  •  স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন দাশ।  নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি (প্রথম খণ্ড)। প্রথম প্রকাশ, তৃতীয় মুদ্রণ [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। অগ্রহায়ণ ১৪০২। নভেম্বর ১৯৯৫। ২১ সংখ্যক গান] [নমুনা]
     
  •  পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
    • সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান ।
    • রাগ: রাগের উল্লেখ নেই।
    • তাল: দাদরা
    • গ্রহস্বর: সা।

 

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।