দুলে চরাচর হিন্দোল-দোলে (dule chorachor hindol-dole)
দুলে চরাচর হিন্দোল-দোলে
বিশ্বরমা দোলে বিশ্বপতি-কোলে॥
গগনে রবি-শশী গ্রহ-তারা দুলে,
তড়িত-দোলনাতে মেঘ ঝুলন ঝুলে।
বরিষা-শত-নরী
দুলিছে মরি মরি,
দুলে বাদল-পরী
কেতকী-বেণী খোলে॥
নদী-মেঘলা দোলে, দোলে নটিনী ধরা,
দুলে আলোক নভ-চন্দ্রাতপ ভরা।
করিয়া জড়াজড়ি দোলে দিবস-নিশা,
দোলে বিরহ-বারি, দোলে মিলন-তৃষা।
উমারে লয়ে বু’কে
শিব দুলিছে সুখে,
দোলে অপরূপ রূপ-লহর তোলে॥
- ভাবসন্ধান: গানটিতে শিব-উমার প্রেমময় মিলনকে কেন্দ্র করে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ছন্দময় গতি, বর্ষার সৌন্দর্য এবং সৃষ্টি-জগতের ঐক্যকে রূপকধর্মী ও কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে প্রকৃতি, মহাকাশ এবং মানবজীবনের সকল অনুভূতি এক মহাজাগতিক আনন্দ-দোলায় যুক্ত হয়ে এক অপরূপ সৃষ্টিসৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটিয়েছে।
এই গানে কবি বিশ্বপ্রকৃতির সর্বব্যাপী ছন্দ, গতি ও আনন্দময় দোলনাকে ঝুলন-উৎসবের রূপকে চিত্রিত করেছেন। তাঁর কল্পনায় সমগ্র সৃষ্টি যেন এক মহাজাগতিক দোলায় দুলছে, আর সেই দোলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিশ্বপতি ও বিশ্বজননী।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, সমগ্র চরাচর ঝুলনের আনন্দে আন্দোলিত। বিশ্বজননী বিশ্বরমা (উমা বা শক্তি) বিশ্বপতি শিবের কোলে দোল খাচ্ছেন। এই ঐশ্বরিক যুগলকে কেন্দ্র করে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এক আনন্দময় ছন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্র সবাই সেই ছন্দে দুলছে। বিদ্যুতের আলোড়নে মেঘমালা ঝুলনের মতো দোল খাচ্ছে।
বর্ষাকালের প্রকৃতিও এই দোলায় অংশগ্রহণ করেছে। বর্ষার শতধারা, মেঘপরী, কেতকীর বেণী—সবকিছু যেন আনন্দে আন্দোলিত। নদী, মেঘ, পৃথিবী, আলো ও আকাশ—প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান এক অপরূপ নৃত্যে মেতে উঠেছে। এখানে প্রকৃতিকে এক নটিনীরূপে কল্পনা করা হয়েছে, যে মহাজাগতিক সুরের তালে দুলছে।
পরবর্তী অংশে কবি বিশ্বজীবনের দ্বৈত অনুভূতিগুলোকেও এই দোলার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। দিন ও রাত, বিরহ ও মিলন, আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তি—সবই পরস্পরকে জড়িয়ে একই ছন্দে দুলছে। অর্থাৎ সৃষ্টি ও জীবনের সকল বিপরীতমুখী অনুভূতি শেষ পর্যন্ত এক মহাসাম্যের মধ্যে আবদ্ধ।
গানের শেষাংশে শিব ও উমার মিলনকে এই বিশ্বদোলার মূল উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে। উমাকে বুকে নিয়ে শিব আনন্দে দুলছেন, আর তাঁদের এই ঐশ্বরিক মিলন থেকে সৌন্দর্য ও রূপের অসংখ্য তরঙ্গ সমগ্র বিশ্বজগতে ছড়িয়ে পড়ছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ (ডিসেম্বর ১৯২৯) মাসে প্রকাশিত 'চোখের চাতক' সঙ্গীত-সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ
- চোখের চাতক
- প্রথম সংস্করণ [কার্তিক ১৩৩৬ (ডিসেম্বর ১৯২৯)। গান ৩৯। হিন্দোল-গীতাঙ্গী]
- নজরুল-রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ফাল্গুন ১৪১৩। ফেব্রুয়ারি ২০০৭। চোখের চাতক। গান ৩৯। হিন্দোল-গীতাঙ্গী। পৃষ্ঠা: ২২০-২২১]
- নজরুল-গীতিকা।
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। ধ্রুপদ। হিন্দোল-গীতাঙ্গী। পৃষ্ঠা ১১১]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭।] নজরুল গীতিকা। ধ্রুপদ। ৮৯। হিন্দোল-গীতাঙ্গী।। পৃষ্ঠা: ২৩৪]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৮৬২]
- চোখের চাতক
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। হরপার্বতী