দেখা দাও, দাও দেখা, ওগো দেবতা (dekha dao, dao dekha, ogo debota)

দেখা দাও, দাও দেখা, ওগো দেবতা।
মন্দিরে পূজারিণী আশাহতা॥
ধূপ পুড়িয়া গেছে, শুকায়েছে মালা,
বন্ধ হ’ল বা দ্বার, একা কুলবালা।
প্রভাতে জাগিবে সবে, রটিবে বারতা॥
জাগো জাগো দেবতা শূন্য দেউলে,
আরতি উঠিছে মোর বেদনার ফুলে।
বাণীহীন মন্দির, কহ কহ কথা॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে কোনো এক ব্যাকুল এক পূজারিণী তাঁর আরাধ্য দেবতার দর্শনলাভে গভীর আকাঙ্ক্ষা, অপেক্ষা, বেদনা এবং আত্মনিবেদনের অনুভূতি উপস্থাপিত হয়েছে। বাহ্যিক পূজার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হলেও দেবতার প্রত্যক্ষ সাড়া না পেয়ে তাঁর হৃদয় হতাশা ও বিরহে আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। তাই এই গান মূলত ভক্তাত্মার সঙ্গে পরমসত্তার মিলনলাভের আকুতি এবং আধ্যাত্মিক প্রতীক্ষার এক মর্মস্পর্শী প্রকাশ।

    গানের সূচনায় পূজারিণী আর্ত কণ্ঠে দেবতার কাছে দর্শন প্রার্থনায়-  নিজেকে ‘আশাহতা’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। কারণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও তিনি তাঁর আরাধ্যের সান্নিধ্য লাভ করতে পারেন নি। এখানে দেবতার দর্শন কেবল মূর্তির আবির্ভাব নয়; বরং ভক্তের অন্তরে দেবতার উপস্থিতির অনুভব ও আত্মিক মিলনের প্রতীক। তাই তাঁর এই আহ্বানের মধ্যে গভীর ব্যাকুলতা ও প্রেম নিহিত রয়েছে।

    গানের পরবর্তী অংশে পূজারিণী তাঁর অপেক্ষার দীর্ঘতা ও নিঃসঙ্গতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর পূজার নিবদিত ধূপ পুড়ে শেষ হয়ে গেছে, পূজার মালা শুকিয়ে গেছে, মন্দিরের দ্বারও বন্ধ হয়ে এসেছে। অর্থাৎ পূজার সমস্ত বাহ্যিক আয়োজন শেষ হলেও দেবতার আগমন ঘটেনি। তিনি একা মন্দিরে বসে আছেন, আর চারদিকে নেমে এসেছে নীরবতা। 'একা কুলবালা' কথাটির মধ্যে তাঁর নিঃসঙ্গতা, অসহায়তা এবং একনিষ্ঠ প্রতীক্ষার বেদনাময় রূপ প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর মনে উদ্বেগ জাগে যে, ভোর হয়ে গেলে সকলেই জেনে যাবে তাঁর ব্যর্থ প্রতীক্ষার কথা।

    পরবর্তী স্তবকে পূজারিণী শূন্য মন্দিরে দেবতাকে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানান। এখানে ‘শূন্য দেউল’ শুধু বাহ্যিক মন্দির নয়, ভক্তের শূন্য ও বিরহাকুল হৃদয়েরও প্রতীক। তিনি জানান যে, তাঁর আরতির উপকরণ এখন আর ফুল, ধূপ বা প্রদীপ নয়; বরং তাঁর নিজের বেদনা, অশ্রু এবং প্রেমময় আকুলতা। অর্থাৎ বাহ্যিক উপাসনা অতিক্রম করে তাঁর অন্তরের যন্ত্রণা নিজেই পূজার অর্ঘ্যে পরিণত হয়েছে।

    গানের শেষাংশে পূজারিণী নীরব দেবতার কাছে একটি উত্তর কামনা করেন। মন্দির বাণীহীন ও নিস্তব্ধ; তাই তিনি আকুলভাবে অনুরোধ করেন—দেবতা যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এখানে ‘কহ কহ কথা’ শুধু শব্দে উত্তর পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং ঈশ্বরের কৃপা, সাড়া ও উপস্থিতি অনুভব করার গভীর বাসনা। ভক্তের কাছে দেবতার একটি ক্ষুদ্রতম সাড়াও পরম প্রাপ্তি।

     
  • রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ (ডিসেম্বর ১৯২৯) মাসে প্রকাশিত 'চোখের চাতক' সঙ্গীত-সংকলনে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০ বৎসর ৬ মাস।
  • গ্রন্থ:
    • চোখের চাতক।
      • প্রথম সংস্করণ [অগ্রহায়ণ মাসে (ডিসেম্বর ১৯২৯)। গান ৫৩। নাগধ্বনি কানাড়া- মধ্যমানি]
      • নজরুল-রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ফাল্গুন ১৪১৩। ফেব্রুয়ারি ২০০৭। চোখের চাতক। গান ৫৩। নাগধ্বনি কানাড়া- মধ্যমান। পৃষ্ঠা: ২২৭]
    • নজরুল-গীতিকা
      • প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। নাগধ্বনি কানাড়া- মধ্যমান। পৃষ্ঠা ১৩৯]
      • নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭।]  নজরুল গীতিকা।  খেয়াল । ১১২। নাগধ্বনি কানাড়া- মধ্যমান। পৃষ্ঠা: ২৫০]
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৮৮৩]
  • রেকর্ড: হিন্দুস্থান রেকর্ড [১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ। ইপি ৩২২২-০০০১। প্রথম পিঠ। শিল্পী জয়ন্তী সেন। সুর ও বাণী কাজী নজরুল ইসলাম] [চিত্র]
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। সাধারণ। দেবতা। অনির্দেশিত। প্রার্থনা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।