দেখে যারে দুল্‌হা সাজে সেজেছেন মোদের নবী (dekhe jare dulha shaje shejechhen moder nobi)

দেখে যারে দুল্‌হা সাজে সেজেছেন মোদের নবী।
বর্ণিতে সে রূপ মধুর হার মানে নিখিল কবি॥
আওলিয়া আর আম্বিয়া সব পিছে চলে বরাতি,
আসমানে যায় মশাল জ্বেলে গ্রহ তারা চাঁদ রবি॥
হুর পরী সব গায় নাচে আজ, দেয় ‘মোবারকবাদ্’ আলম্,
আর্‌শ কুর্শি ঝুঁকে পড়ে দেখতে সে মোহন ছবি॥
আজ আরশের বাসর ঘরে হবে মোবারক রুয়ৎ,
বুকে খোদার ইশ্‌ক নিয়ে নওশা ঐ আল-আরবি॥

  • ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক ভক্তির প্রকাশ ঘটেছে। কবি ইসলামী ঐতিহ্যে বর্ণিত মিরাজের মহিমান্বিত ঘটনাকে রূপকভাবে এক ঐশী বিবাহযাত্রা বা বরযাত্রার চিত্রে কল্পনা করেছেন। এখানে মহানবীকে 'দুলহা' বা বররূপে উপস্থাপন করে তাঁর অনন্য মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে।

    গানের সূচনায় কবি বলেন যে, মহানবী এমন অপরূপ বরবেশে সজ্জিত হয়েছেন, যার সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। তাঁর সেই রূপ এতই মধুর ও মোহনীয় যে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিরাও তা যথাযথভাবে বর্ণনা করতে অক্ষম। এখানে নবীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তাঁর আধ্যাত্মিক মহিমা, পবিত্রতা ও নূরানী সত্তাকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    প্রথম অন্তরাতে কবি কল্পনা করেছেন যে, সকল আওলিয়া (আল্লাহর প্রিয় বান্দা) ও আম্বিয়া (নবীগণ) তাঁর বরযাত্রার সঙ্গী হয়ে পিছনে চলেছেন। আকাশমণ্ডলে গ্রহ, নক্ষত্র, চাঁদ ও সূর্য যেন মশালধারীর ভূমিকা পালন করছে। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মহানবীর মর্যাদা এত উচ্চ যে সমগ্র সৃষ্টি তাঁর এই মহিমান্বিত যাত্রার সাক্ষী ও অংশীদার হয়ে উঠেছে।

    দ্বিতীয় অন্তরাতে জান্নাতের হুর ও পরীরা আনন্দগান ও নৃত্যের মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছে বলে কল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরশ ও কুরসিও যেন তাঁর সেই মোহনীয় রূপ দর্শনের জন্য নত হয়ে পড়েছে। এখানে আরশ ও কুরসির উল্লেখ মহানবীর আধ্যাত্মিক মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরকে নির্দেশ করে। কবির অনুভূতিতে সমগ্র জগত তাঁর আগমনে আনন্দ ও শ্রদ্ধায় অভিভূত।

    শেষ অন্তরাতে মিরাজের চূড়ান্ত তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। কবি কল্পনা করেছেন যে, আজ আরশের বাসরঘরে মহানবীর জন্য এক মহামিলনের আয়োজন হয়েছে। এখানে 'বাসরঘর' ও '[রুয়ৎ' শব্দ দুটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য, ঐশী সাক্ষাৎ এবং পরম প্রেমের মিলনকে বোঝানো হয়েছে। মহানবী তাঁর অন্তরে খোদার প্রেম ধারণ করে সেই মহাসান্নিধ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। ‘নওশা ঐ আল-আরবি’ বলতে আরবের সেই মহিমান্বিত বর—হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কেই বোঝানো হয়েছে।

     
  • রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। জয়তী পত্রিকার 'কার্তিক-পৌষ ১৩৩৮' সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩২ বৎসর ৫-৬ মাস।
     
  • গ্রন্থ:
    • জুলফিকার
      • প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২ (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)। ১০ম গান। সিন্ধু-কার্ফা
      • নজরুল রচনাবলী,  জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা।  জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭,  জুলফিকার। ১০ সংখ্যক গান। সিন্ধু-কার্ফা। পৃষ্ঠা: ২৯৬-২৯৭।
    • নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৮২১]
  • পত্রিকা: জয়তী [কার্তিক-পৌষ ১৩৩৮ (সেপ্টেম্বর ১৯৩১-জানুয়ারি ১৯৩২)]
  • রেকর্ড: এইচএমভি [মে ১৯৩২ (বৈশাখ -জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৯)। এন ৪১৯৮। শিল্পী: ফখরে আলম।  [শ্রবণ নমুনা] 
     
  • স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সালাউদ্দিন আহ্‌মেদ [নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, পঁচিশতম খণ্ড,  নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ভাদ্র, ১৪১২/আগস্ট ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ] ১৮ সংখ্যক গান। [নমুনা]
     
  • পর্যায়:
    • বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল। বন্দনা
    • সুরাঙ্গ: কাওয়ালি
    • তাল: কাহারবা
    • গ্রহস্বর: সা

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।